Wednesday, 5 December 2012

ছবি যখন ফ্র্যাংকেনস্টাইন ফেক!

গত সোমবারে আমেরিকার উত্তর-পূর্ব কোণের অধিক সমৃদ্ধ ও বসতিপূর্ন এলাকায় আঘাত হানে শক্তিশালী ঘুর্ণিঝড় স্যান্ডি। ক্যাটাগরি দুই এই হারিকেনের তাণ্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে যায় নিউ জার্সি, নিউ ইয়র্কসহ গুরুত্বপূর্ণ জনপদের কোস্টাল এরিয়াগুলো। বিদ্যুৎ, সাবওয়ে ট্রেন সার্ভিস, রাস্তাঘাট, বন্দর ইত্যাদি ব্যাপক ক্ষেত্রে নজিরবিহীন ক্ষতির মুখে পড়ে অঞ্চলগুলো। Mary Shelley এর বিখ্যাত দানব Frankenstein যেন রূপ নিয়েছিলো সুপারস্টর্ম স্যান্ডির, তাই এর প্রাকান্ডতা বোঝাতে দেয়া হয় Frankenstorm নাম। বিশেষজ্ঞদের মতে ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে এটা শতাব্দীর ভয়াবহতম ঘুর্ণিঝড়, যা কমপক্ষে ৫০ মিলিয়ন মানুষের জীবনকে এনেছিলো হুমকির মুখে এবং তাদের জীবনযাত্রা ব্যাহত করেছে সম্পূর্ণরূপে। মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০০ তে, যারমধ্যে ৭০ জনই শিকার হয় ক্যারিবীয় উপকূলীয় আঘাতের। যাই হোক, স্যান্ডির ভয়াবহতা, রেখে যাওয়া ক্ষয়ক্ষতির হিসেব এসবের কোনোটাই আমার আজকের লেখার মূল বিষয় নয়। যে কারণে সব কাজ ফেলে এক প্রকার জোড় করেই লেখাটি লিখতে বসলাম তা কিছুটা ভিন্ন। ঠিক যে মুহূর্তে আমেরিকার উত্তর-পূর্ব উপকূল জুড়ে চলছে প্রচন্ড উষ্ণ অতলান্তিকীয় বায়ুর প্রভাবে হারিকেন স্যান্ডির তাণ্ডব, ঠিক সে মুহূর্ত থেকেই অতলান্তিকের এপাড়ে বসে কিছুটা উদ্বিগ্নতায় সাথে কুখ্যাত এই ঝড়টির আপডেট জানার চেষ্টায় খানিক পরপরই নেট গুঁতা-গুঁতি করে যাচ্ছিলাম। ঝড়ের ইমেজ ঘাঁটতে গিয়ে কমপক্ষে শ'খানেকের মতো আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে যাওয়া ইমেজ চোখে পড়লো। এবং এক পর্যায়ে চোখ আটকালো ডিসকভারি নিউজের একটি আর্টিকেলে - Top 5 Fake Hurricane Sandy Photos। সচলে হয়তো অনেকেই এই ফেক ছবির বিষয় সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত আছেন। বিশেষ করে বর্তমানে এই ডিজিটাল যুগে যেকোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা নানা চাঞ্চল্যকর ঘটনায় খুব দ্রুত ফেসবুক, টুইটারসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক মাধ্যমগুলোতে যেসব বানোয়াট মিথ্যে ছবিতে সয়লাব হয়ে যায়, আমার আজকের আলোচনা মূলত এধরনের কিছু ফেক ছবি নিয়ে।

এই ফেক ছবিগুলো বাস্তব ঘটনার সাথে মিল রেখে এতো নিখুঁতভাবে তৈরী করা হয় যে, আপনার পাকা চোখও একবারের জন্যে হলেও থমকে যেতে বাধ্য। আর শুধু সান্ডির বেলায় নয় এমন আপত্তিকর মিথ্যে ছবি প্রকাশিত হচ্ছে হরহামেশাই। আজকে এরকমই কিছু ছবি নিয়ে আলোচনা করবো। এই আলোচনায় ফটোশপের কাজ ছাড়াও যেসব ছবির বিষয়বস্তু মূলত সত্য কিন্তু ব্যবহৃত হয়েছে উদ্দেশ্য-প্রণোদিতভাবে মিথ্যে জায়গায়, তাকেও সমানভাবে ফেক ধরা হবে।

প্রথমে একদম 'ফ্রেশ ফেক' ডিসকভারির আর্টিকেলটিতে পাওয়া স্যান্ডির ফেক ছবিগুলো দিয়েই শুরু করিঃ

ছবি-একঃ

(Ominous Clouds Looming Over Statue of Liberty)

নিউ ইয়র্ক টাইমসের বড় বড় সব মহারথীরা উপরের ভুয়া ছবিটিকে হারিকেন স্যান্ডির ছবি বলে দিব্বি চালিয়ে দেয় নিজেদের ওয়েবসাইটে, টুইটারে। যা মূলত মাইক হোলিংশিডের ছবি নাব্রাস্কা সুপার সেল ও নিউ ইয়র্ক হারবার (ইন্ডিপেনডেন্ট ডে মুভি থেকে নেয়া) এর সংমিশ্রণে ঘুটা মারা এক উৎকৃষ্ট ফটোশপের নমুনা।

আসল ছবি

ছবি-দুইঃ

(Sinister Clouds Threaten to Swallow Empire State Building)

সত্য ছবি, মিথ্যে প্লট। ছবিটি স্যান্ডির ছবি হিসেবে ফেসবুক, টুইটারসহ অন্যান্য মাধ্যমে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে এটি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ২০১১ এর ছবি।

আসল ছবি

ছবি-তিনঃ

(Waves Crashing On Statue of Liberty)

আরেকটি দ্রুত ও সহজ ফটোশপের নমুনা। অরিজিনাল ছবিটি 'দ্যা ডে আফটার টুমরো' মুভির ওয়ালপেপার।

মূল ছবি

ছবি-চারঃ

(Dark Clouds Rolling Over the George Washington Bridge)

জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজের উপর কালো মেঘের ঘনঘটা, ঝড়ের পূর্বের তীব্র চন্ডালরূপী আকাশ। ছবির উপাদানগুলো নিঃসন্দেহে পুরোপুরি সুপার স্যান্ডির সা্থে গেলেও বস্তুত ছবিটি নেয়া হয়েছে 'গেটি ষ্টক' ২০০৯ থেকে।

মূল ছবি

গেলো স্যান্ডি নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অসাধারণ অথচ ভুয়া কিছু ছবির কথা। প্রশ্ন হলো কেন এই প্রতারণার আশ্রয়? এতে আদৌ কি কারো কোনো লাভ হয়? উত্তর খুব সোজা আপনার বিনোদনের পাতে সবচেয়ে প্রথম ও আকর্ষণীয় খোরাকটি পৌঁছে দিতেই এত্তো হুড়াহুড়ি। উপরের ছবিগুলোর উদ্দেশ্য একটাই আর তা হলো সবার আগে মানুষকে এন্টারটেইন করার টেন্ডেন্সি, বাস্তবে দুর্যোগটির রূপ কেমন, কতজন মানুষ ঠিক সেই মুহূর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অসহনীয় মুহূর্ত পার করছে, তা নিয়ে প্রকৃতপক্ষে কোনো মাথা-ব্যথা এই ফেকার তথা বিনোদনকারীদের থাকে না। তাদের কাছে মানুষের কষ্ট-দুর্ভোগ-আহাজারি, বিপদ্গ্রস্ত জনপদ-সভ্যতা সবই শুধু নিউজ। আর তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে অপেক্ষাকৃত আকর্ষণীয় উপায়ে সবার আগে, প্রয়োজনে মিথ্যা মাল-মশলা-তকমা মিশায়ে। হু কেয়ারস! পাবলিক কিছু বুঝে উঠার আগেই তো কেল্লা ফতে!

তবে যাই বলি না কেন, একটা বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এই ফেকাররা নিঃসন্দেহে ক্রিয়েটিভ, একটিভও বটে। যেকোনো বিষয়ে তাদের ক্রিয়েটিভিটি আর অ্যাক্টিভিটির উদাহরণ পদে পদে। তাদের ক্রিয়েটিভিটির একটি দারুণ উদাহরণ নিচে দিলাম।

ছবি-পাঁচঃ



চে গুয়েভারা ও জন লেনন দুই মহামানব একসাথে নিবিষ্ট মনে সঙ্গীত চর্চায় ব্যস্ত! ছবিটি দেখে প্রথমে চমকে যাই, খানিকক্ষণ চোখে বিস্ময় আর প্রশ্ন নিয়ে তাকায় থাকি। এখান থেকে প্রাপ্ত বিশ্লেষণ অনুযায়ী এটা আসলে আরো একটা ক্রিয়েটিভ ফেকের নমুনা। ব্যাপারটার ধরতে পেরে আমার নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠে, এক্ষেত্রে রাগের বদলে ফেকারদের ক্রিয়েটিভিটিকে কেন জানি আনমনে অ্যাপ্রিশিয়েট করি। তোফা আইডিয়া, সন্দেহ নাই! যদিও ছবি ফেক।

আসল ছবিটি হলো -

আসল ছবিতে জন লেনন তার সমসাময়িক গিটারিস্ট ওয়েইনি গ্যাবরিয়েল অনুশীলনে ব্যস্ত।

আবার ফিরে আসি দুর্যোগে - ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০ সাল, স্থানীয় সময় ৩:৩৪ মিনিট। ৮.৮ (MMS) মাত্রায় ৩ মিনিট স্থায়ী seismograph রিপোর্ট অনুযায়ী এযাবতকালের ৬ষ্ঠ শক্তিশালী ভূমিকম্পটি আঘাত হানে চিলির উপকূলীয় কেন্দ্রের আবাসিক অঞ্চলগুলোতে। সরকারী হিশেব মতে এ দুর্যোগে প্রাণ হানির সংখ্যা প্রায় ৫২৫ জন, ২৫ জনের মত নিখোঁজ, আর মোট জনসংখ্যার ৯% মানুষ হারায় তাদের প্রিয় বাসস্থান। বিস্তারিত এখানে









আগেই বলেছি সব ক্ষেত্রেই যে ছবি এডিট, ফটোশপ, জোড়া-তালি, ঘুটা মারার প্রয়োজন পড়ে, তা নয়। জ্ঞানী মুমিনরা তার চেয়ে কম পরিশ্রম বা মাথা খাটিয়ে, অপেক্ষাকৃত সহজ ও বলদীয় উপায়ে নিজের বক্তব্য পরিবেশন করে থাকে। নিচে লক্ষণীয় -

ছবি-ছয়ঃ




উপরের ছবিটি যে কতটা উর্বর মস্তিকের জ্বলন্ত উদাহরণ, তা নিয়ে মনে হয় না আর কিছু বলার প্রয়োজন আছে! যা বলার আগের ছবিগুলোই তা বলে দিচ্ছে। শুধু কিছু প্রশ্ন এই অধমের মাথায় চাড়া দিয়ে উঠছে, কেউ যদি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে তার ধর্ম সত্য ও ন্যায়ের, তাহলে সে নিজেই কেনো নির্লজ্জ মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সে ধর্মকে কলঙ্কিত করছে? তাহলে কি তার নিজের বিশ্বাসের উপর নিজের আস্থা নেই! কেউ যদি জানে, সৃষ্টিকর্তা যা দেখানোর তা দেখাবে। তাহলে কি সেটা সৃষ্টিকর্তার উপর ছেড়ে দেয়াটাই যুক্তিযুক্ত নয়? বরং এই মিথ্যাচার দিয়ে যা প্রমাণিত হয়েছে তা হলো, প্রথমতঃ কেউ বা কারা ধর্ম ও খোদার নাম ভাঙ্গিয়ে নিজেরা কতটা মূর্খ তার পরিচয় দিয়েছে। দ্বিতীয়তঃ শুধু তাই নয় সে বা তারা সেই খোদার উপর মাতবরি করে নিজেই খোদা হবার চেষ্টা করেছে।
সবশেষে ফেকিং এ মিডিয়ার রূপ তুলে ধরতে খুব পরিচিত একটি ছবি।

ছবি-সাতঃ


উপরের ছবিতে একটি ঘটনাকে মিডিয়া কিভাবে নিজের সুবিধামত ভিন্নরূপে কাভারেজ করে তা দেখানো হয়েছে। একটি সত্য ছবি প্রকাশের ভিন্ন স্টাইলের দরুণ নিঃসন্দেহে দু'ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত দু'রকম প্রভাব ফেলতে পারে। "Half truth is worse than complete lie" - কথাটা এক্ষেত্রে পুরোপুরি খেলে যায়!

হ্যাঁ, ছবি কথা বলে। শুধুমাত্র একটি ছবি পারে হাজারো মানুষের ভেতরে ঝিমানো মনুষ্যত্বকে নাড়া দিয়ে তলিয়ে যাওয়া চেতনাকে এক করতে, এরকম উদাহরণও আছে ভুরিভুরি। তাই বলা হয়ে থাকে, একটা ছবি হাজারটা শব্দের চেয়ে বেশি কার্যকর। অথচ ভেবে দেখুন সে ছবি যদি হয় মিথ্যা, তাহলে অবশ্যই তার বিপরীত প্রভাব পড়বে। এবং যা হবে হাজারটা মিথ্যার চেয়ে বেশি ভয়ংকর! যার তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে কিছুদিন আগে বহুল আলোচিত রামু, পুটিয়ার ঘটনায়। অতএব বর্তমানে এই ফেকিং ও যথেচ্ছার রাজত্বে, নিজেকে 'জ্যাক অ্যাস' বানানোর হাত থেকে রক্ষার দায়িত্ব আপনার নিজের। যেকোনো সন্দেহজনক, মনে প্রশ্ন জাগে এরকম ছবিতে ছোখ বন্ধ করে বিশ্বাসের আগে, অন্তত আরেকবার তা ভালো করে দেখুন, নিজের মাথা (জ্ঞান-বুদ্ধি, বিচার-বিবেচনা) খাটান। নিজে সত্য জানার চেষ্টা করুন এবং অন্যকে জানতে সাহায্য করুন। নিজের মধ্যে সচেতনতা বাড়ান এবং দশজনের মাঝে তা ছড়িয়ে দিন! যেহেতু এরকম বস্তা বস্তা আলোচনা ঐ সব নির্লজ্জ ফেকার বা মিডিয়ার উপর কোনই প্রভাব ফেলবে না, এক ফোঁটাও কমাবে না তাদের ফেকিং অ্যাক্টিভিটি। তাই নিজের সচেতনতার বিকল্প কিছু নাই।
------------------------------------------------------------------------------

ছবিগুলো নেট থেকে নেয়া
স্যান্ডিতে ব্যবহৃত তথ্যসূত্র -
বিবিসি
ডিসকভারি নিউজ -১
ডিসকভারি নিউজ -২

--------------------------------------------------------------------------------

সাজেদারা হারিয়ে যায়

আজ অনেকদিন পর মায়ের বাসায় নিজের পুরনো বই-খাতাগুলো নিয়ে বসলো নূপুর। টেনে নিলো বেশ ক'বছরের অবহেলায় ধুলো জমা গাদাখানেক নোটবুক। যেন খুঁজে পেয়েছে এমন একটা ভাব করে তুলে নিলো সেখান থেকে একটা, দ্রুত হাতে উল্টাতে থাকলো ওটার পাতাগুলো, শেষে এক জায়গায় এসে থেমে গেলো সে, চোখ আটকে থাকলো ছোট্ট একটা লাইনে -- 'আমার নাম সাজেদা'। কেউ জানলো না, কি তীব্র ঝড় বয়ে যেতে লাগলো তার ভেতর দিয়ে! স্মৃতি-ঝড়। সাইমুম, সাইক্লোনের চেয়েও খারাপ এ ঝড়। যা সরাসরি আঘাত করে মানুষের কালে, তলিয়ে দেয় বর্তমান, মুহূর্তে নিয়ে যায় ফেলে আসা অতীতে -

ছাদের নিচে ছোট্ট এক রুমের একটা বাসা। নিজের, একান্ত নিজের একটা সংসার। আপন নীড়। জীবনে প্রথমবারের মত বাবা-মায়ের ছায়া শেকল থেকে বেরিয়ে মাথার উপর খোলা আকাশটা পেয়ে সে দিশেহারা। মুক্তি ও পূর্ণতার ডানা মেলে ধরেছে নির্দ্বিধায়। সারাদিন পুতুলখেলায় মেতে থাকার মতোই পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখে নিজের ঘরদোর। হাতে গোনা ক'টা আসবাব, তাও আবার এপাশ-অপাশ করে অহেতুক, বারবার। দিন-দুনিয়ার হিসেব তখন তার কাছে অর্থহীন, মাথাব্যথাও ছিলো না রাজনীতি, দেশ বা অন্য কোনো বিষয়ে, যা কিছু ছিলো তার ছোট্ট ঘরটার বাইরে। সে সময় বিরোধীদলের ডাকা একের পর এক হরতালগুলো ছিলো বরং তার কাছে মেঘ না চাইতে জলের মতই অতি-আনন্দের! কারণ হরতালে সারাদিন কাছে পাবে প্রিয় মানুষটিকে। আর ঠিক রাতে শুতে যাওয়ার আগে নিয়ম মেনে কারেন্ট চলে যাওয়াও প্রচন্ড গরমে যোগ করত আলাদা রোমাঞ্চের। রোজ তাড়াতাড়ি রাতের খাবার সেরে, তারা অপেক্ষা করতে থাকত এবং কারেন্ট যাওয়া মাত্রই গীটারটা নিয়ে সোজা ছাদে। পল্লব ফেরার পথে ছাদের চাবিটা দারোয়ানের কাছে থেকে নিয়ে আসতো, আবার কখনো অন্ধকারেই নিচে গিয়ে চাবিটা আনতে হতো।

ছাদে তাদের প্রিয় একটা কোণ ছিলো, সে দিকটায় তখনো কোনো বাড়ী উঠে নাই, একপাশে রাস্তা, রাস্তার ওপাশেও তখন ফাঁকা প্লট, তারপর বড় মেইন রাস্তা। জ্যোৎস্না রাতে মনে হতো পৃথিবী থেকে তারা সম্পূর্ণ বিছিন্ন দু'জন মানব-মানবী। আপন মনে গীটার বাজাতো পল্লব আর নূপুর বেড়ালের মত গুটিশুটি মেরে ওর হাতের ফাঁকা-ফুকো দিয়ে ঠিকই কোলের মধ্যে আরামের জায়গা করে নিতো। বেড়ালের মতই চোখ বন্ধ রেখে মিউ মিউ করে আব্দার করে যেতো, একটার পর একটা গানের। কখনো - কাঞ্চন জঙ্ঘা, বেলা বোস, আমার চক্ষু নাই... আবার কখনো - ববি রায়ের কথায় চলে যেও না ছেড়ে আমায়...

একদিনের কথা মনে পড়লে এখনো লজ্জা পায় নূপুর, যেদিন বাড়িওয়ালী আন্টি এসে বলল - "তোমরা নাকি টোনা-টুনি রোজ ছাদে উঠে টুংটাং করো?" সে ভেবেছিলো কমপ্লেইন করতে এসেছে বুঝি, তাই কি বলবে ভেবে পাচ্ছিলো না। বাড়িওয়ালী তাকে অবাক করে দিয়ে ছাদের আরেকটা চাবি ধরিয়ে দিয়ে বলল - "এটা রাখো, যখন খুশি ছাদে গিয়ে টুংটাং করবা!"

অফিস থেকে ফেরার পথে প্রায়ই পল্লব হাত ভরে নিয়ে আসতো দোলনচাঁপা, নূপুরের প্রিয় ফুল। খুব যত্ন করে জারে পানি ঢেলে রেখে দিতো সে, পুরো বাড়ি মন পাগল করা বেহেশতী গন্ধে ভরে যেত! এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিলো স্বপ্ন আর কবিতার মত! এক সময় নূপুর আবিষ্কার করলো তার ভেতরে জন্ম নিচ্ছে নতুন আরেক স্পন্দন! প্রথমে ভয় তারপর অদ্ভুত মোহাচ্ছন্ন ভালো লাগায় ভরে উঠলো তার মন! শুধু বাবা, মা-কে জানাবে কিভাবে এ চিন্তায় তারা দু'জনেই লজ্জায় লাল! কারণ মা বলেছিলো লেখাপড়া শেষ হওয়ার আগে যেন উল্টা-পাল্টা কিছু না হয়। আর সেই 'উল্টা-পাল্টা কিছু' টা যে এত তাড়াতাড়ি বাধিয়ে বসেছে, তা এখন বলে কোন মুখে। তাই নিঃশব্দে তারা দু'জন দু'জনকে অভিনন্দন জানালো। নূপুর কল্পনায় বুঁদ হয়ে মা হবার অনুভূতিটাকে নিজের মধ্যে তরিয়ে তরিয়ে অনুভব করতে লাগলো।

বাড়িওয়ালী আন্টির স্বভাব ছিলো দু'দিন পর পর নূপুরের খোঁজখবর নেয়া। সে তার অভিজ্ঞ চোখে মুহূর্তে কেমন করে জানি ধরে ফেলেছিলো নূপুরের অদৃশ্য পরিবর্তন। কোত্থেকে এক কাজের মেয়ে নিয়ে এসে বলল - "তোমাকে সারাদিন কাজ করতে দেখি। এসময়ে ভারী কাজ করা ঠিক না। মেয়েটাকে রাখো। নতুন ঢাকায় আসছে, এখানকার হাওয়া-বাতাস এখনো গায়ে লাগে নাই।"

নূপুর অবাক হয়ে বললো - "সেকি! ও ঢাকায় আসলো কিভাবে?"

"এক ব্যাটা ওকে গ্রাম থেকে বিয়ে করে আনছিলো, কাছেই এক বস্তিতে ঘর ভাড়া করে সংসারও করছে দুই মাস, তারপর সে লাপাত্তা। বেচারীর এখন পেট শুকায়ে মরার দশা! গ্রামে ফেরত নেয়ার মতোও কেউ নাই, সৎ মায়ের ঘরে দাসি বান্দি করে বড় হইছে। বাপ মরার পর খোঁজখবর না নিয়েই, কোনোরকমে আপদ বিদায় করছে সেই মায়।" - এ যেন রোজকার খুব স্বভাবিক গল্প, এমন একটা ভাব করে বলল বাড়িওয়ালী।

এবার রীতিমত ধাক্কা খায় নূপুর। দুই মাসের কিছু বেশি সময় সেও স্বামীর সাথে আছে। মফঃস্বল থেকে ঢাকায়। পল্লবের সাথে অবশ্যই ওই মেয়েটির স্বামীর তফাৎ আছে, কিন্তু কোথায় জানি নিজের সাথেই ওর মিল খুঁজতে থাকে। তাকায় মেয়টার দিকে -

নিতান্তই বাচ্চা একটা মেয়ে। আর নিত্য ঘাটতির সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে ওঠা শরীরটাতেও স্পষ্ট দৈন্যতার ছাপ। গায়ে বেঢোপ আলখাল্লা সাইজের সালওয়ার-কামিজ। দেখে প্রায় হেসে ফেলেছিলো সে। তার উপর মস্ত বড় একটা ওড়না দিয়ে কপাল থেকে প্রায় হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা। শুধু ক্লান্ত চোখ দু'টো দিয়ে ঠুকরে বেরিয়ে আসা অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা! কোনো আবরণ ঢাকতে পারেনি তা। বেশিক্ষণ তাকাতে পারলো না সেখানে নূপুর, বুকটা কেমন হা হা করে উঠলো!
"কি নাম রে তোর?"- জানতে চাইলো সে।

"সাজেদা।"- জবাব দিলো মেয়েটা।

----------------------------------------------------------------------------------
সাজেদা রোজ আসা শুরু করলো। সারাদিন থাকে। যতক্ষণ না তাকে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়া হয়, সে চুপচাপ রান্নাঘর বা বারান্দার এক কোণে বসে থাকে। 

নূপুর একদিন জিজ্ঞেস করেছিলো - "এতো দেরি করে যাস কেন?"

"একা ঘরে ঢুকতে ডর করে।" - বলেছিলো সাজেদা।

"কেনো?"

"পাশের ঘরে হের দুরসম্পর্কের এক বোন থাকে, গার্মেন্টসে কাম করে। আর তার স্বামী সারাদিন লাফাঙ্গা পোলাগো লগে গাঞ্জা টানে, বৌ না থাকলে আমার ঘরে উঁকি দেয়।"

সাজেদার ভয়ের কারণ বুঝতে পেরে গা কাঁটা দিয়ে উঠে নূপুরের! পায়ের নিচে মাটি শক্ত করে, গলায় জোর এনে বলেছিলো - "তুই এখানেই থাক!"

কিন্তু সাজেদা বলেছিলো - "হে যদি আসে!"

অদ্ভুত ধোঁয়াশায় যুঝছিলো সাজেদার মন, স্বামী ফিরে আসবে এ বিশ্বাস তখনো তাকে শক্তি দিচ্ছিলো, চারপাশের প্রতিকূলতাগুলোর বিরুদ্ধে টিকে থাকতে। নূপুরেরও তখন জীবনের নির্মম বাস্তবতার সাথে পরিচয় ছিলো না। তার ভেতরের নব্য পরিণতা নারীও কেন জানি সাজেদার বিশ্বাসকেই সমর্থন করতে চাইতো। মনে মনে ভাবতো, হয়তো সত্যি ফিরবে সাজেদার স্বামী! তাই রোজ ওর মুখে তাকাতো একটু আলো দেখবে বলে, কখনো উত্তেজনা চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করেও বসতো - "কিরে ফিরেছে সে?"

----------------------------------------------------------------------------------
নূপুর আর পল্লবের গাদা গাদা বইয়ের পাহাড় জমে যাচ্ছিলো। মাঝে সাঝে সেগুলোর ধুলো ঝাড়পোঁছ করে নিজেরটা আর পল্লবেরটা আলাদা করে গোছানোর চেষ্টা করতো সে। একদিন দেখে সাজেদা খুব আগ্রহের সাথে জ্ঞানকোষের পাতা উল্টাচ্ছে, কৌতূহল থেকে জানতে চাইলো - "তুই পড়তে পারিস?"

"পারি।"

"একটু পড়ে শোনা তো?"

সাজেদা পড়া শুরু করলো, ঝর ঝরে রিডিং, কোথাও আটকালো না, উচ্চারণে আঞ্চলিক টান ছাড়া আর কোনো সমস্যা ছিলো না। 

হাতের কাছেই নূপুরের ক্লাসের একটা নোটবুক ছিলো এগিয়ে দিয়ে বললো - "লিখ তো?"

সাজেদা গোটা গোটা অক্ষরে স্পষ্ট করে লিখলো - 'আমার নাম সাজেদা'। 

"কেলাশ এইট পড়ছিলাম, হের পর বিয়া হইলো!" আপন মনেই যেন নিজেকে শোনালো সে।

অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে নূপুরের ভেতর থেকে!

এর মাঝে একদিন একটা ঘটনা ঘটলো। রান্না ঘরে ওরা দু'জনে কাজ করছিলো, সাজেদা একটু দুরে সিঙ্কে থালাবাসন ধুচ্ছিলো। হঠাৎ সে শূন্যে হাত তুলে কিছু আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করলো, তারপর ধড়াম করে পড়ে গেলো। নূপুর কি করবে বুঝে উঠতে পারেনি, শুধু এটুকু বুঝলো এটাকে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া বলে। হাতের কাছেই পানি ছিলো, চোখে মুখে দেয়া শুরু করলো। একটু পরেই চোখ মেললো সাজেদা। তারপর ওকে নিয়ে গেলো পাশের এক হসপিটালে। সাজেদা যেতে চাইছিলো না, ওর নাকি এরকম মাথা 'চক' প্রায়ই লাগে, আবার নিজেই ঠিক হয়ে যায়। রিক্সায় নূপুরের ভয় হচ্ছিলো সাজেদা আবার পড়ে যায় কিনা, তাই ধরে রেখেছিলো তাকে শক্ত করে। হসপিটাল গেটে টিকেট করার সময় নূপুরের হাত কাঁপছিল।

ডাক্তারও প্রথমে নূপুরকেই জিজ্ঞেস করেছিলো - "কি সমস্যা?"

নূপুর সাজেদাকে দেখিয়ে বলেছিলো - "ও মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলো।"

ডাক্তার সাজেদাকে পরীক্ষা করে বলল - "তেমন কিছু না, দুর্বলতা থেকেই ফেইন্ট হয়েছে। রেস্ট প্রয়োজন।" 

সাজেদা যে প্রেগন্যান্ট সেটা ওখানেই ডাক্তারের কাছ থেকে জানলো নূপুর।
দু'জন নার্স ফেরার পথে তাদের ধরলো কিছু করাতে চাইলে যাতে দেরি না করে, ওদের পরিচিত এক জায়গায় এসব কম খরচে করানো হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি। ওরা মনে মনে সূত্র মিলিয়ে নিয়েছে, সাজেদার গর্ভের সন্তান অবৈধ, সে সন্তানের পিতা হয়তো পাশের মেয়েটার অর্থাৎ নূপুরের স্বামী। নূপুর চোখ-কান বুঝে সেই দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে কোনরকমে বেরিয়ে আসে।
তার ভেতরটা সমানে হাহাকার করে যাচ্ছিলো, এই মেয়েটা এতবড় হতভাগী যে জীবনে মা হবার মতো আনন্দটুকুও প্রাণভরে উপভোগ করার উপায় নাই। অন্যদিকে সাজেদা তখনো নির্বিকার!

নূপুরের সাধের ঘর ঝাড়াপোঁছা বন্ধ হয়ে গেলো। সে তার পছন্দের মজার কিছু বই সাজেদা কে দিয়ে পড়াতে শুরু করলো - টুকুনজিল, হাত কাটা রবিন, টুকি ঝাঁ, পাগলা দাশু, প্রফেসর শঙ্কু... একেক দিন একেকটা, বিশেষ করে বেছে বেছে হাসির অংশগুলো বার বার পড়তে বলত। সাজেদা জোরে জোরে পড়তো, আর নূপুর পেট চেপে হো হো করে হাসতো। তাকে হাসতে দেখে সাজেদাও হাসতো। আবার কখনো খুব সিরিয়াস কোনো নাটকের কষ্টের মুহূর্ত দেখে দু'জনেরই চোখ ভেসে যেতো।

----------------------------------------------------------------------------------
এটা সত্য যে পল্লব বাসায় থাকলে সাজেদার উপস্থিতি তাদের দু'জনের জন্যেই খুব অস্বস্তিকর ছিলো। তখন তাদের ছোট ঘরটা কেমন যেন আরো ছোট হয়ে যেতো। পল্লব প্রায়ই নূপুরকে বলতো সাজেদাকে বলো ছুটির দিনগুলোতে যেন না আসে। কিন্তু সে পারতো না। সে তো জানে সাজেদা কেন আসে, এক দণ্ড নির্ভরতার আশ্রয়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে। 

৭২ ঘন্টার হরতাল। পল্লব বাসায়। সেদিন স্বামীর মন রক্ষার্থে নূপুরকে খুব বেশি স্বার্থপর হতে হয়েছিলো, সাজেদাকে বলেছিলো - তিন দিন তোর ভাই বাসায় থাকবে, এ ক'দিন তুই আসিস না। সাজেদা কিছু বলে নাই চুপচাপ চলে গেলো। কিন্তু সে ক'দিন অজানা আশংকা আর ভয়ে অস্থির হয়ে থাকল নূপুর।

প্রথম বারের মত টানা পাঁচদিন আসে নাই সাজেদা। মনে মনে অস্থির হয়ে নূপুর যখন ভাবছিলো ওর খোঁজে যাবে কিনা, তখন সে এলো। অস্থিরতা রাগে পরিনত হয়, কিছুটা ঝাঁঝালো স্বরে জানতে চায় সে - "এ ক'দিন আসিস নাই যে?"

"হরতালে আমার স্বামী ফিরছে।" সাজেদা জবাব দেয়।

চোখে বিস্ময় ঠুকরে বের হলো নূপুরের।
সাজেদা আঁচলে লুকানো হাতটা তার সামনে মেলে ধরে বলে - "আমার জন্যে এটা আনছে।" ওর হাতে একটা শাড়ি। মেরুন রঙ, জরির পাড়।

নূপুরের চোখে জল এসে গেলো, গলায় মিথ্যে অভিমান টেনে বলল - "ও আচ্ছা, তাই স্বামীকে পেয়ে আমাকে ভুলে গেছিলি বুঝি!"

------------------------------------------------------------------------------------
নূপুরের মা হবার খবরটা পেয়ে আর দশটা মায়ের মতোই নূপুরের মা-ও তাকে নিয়ে যথারীতি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন! মেয়ের পড়াশুনা, বাচ্চা, শরীর কোনটারই যাতে কোনো ক্ষতি না হয় তাই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো বাকী সময়টা সে মায়ের বাড়িতেই থাকবে। মা নিজে এসে তাকে নিয়ে গেলো। নূপুর চলে গেলো, তার ছয় মাসের ছোট্ট সংসারটা রেখে।

এরপর পড়াশুনা ক্লাস ইত্যাদি নিয়ে সে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়লো। মায়ের বাড়িতে আদর-যত্ন, সেবা-শুশ্রুষায় কোনোটারই কোনো কমতি ছিলো না। পল্লবও সুযোগ পেলেই তাকে দেখে আসতো। তারপরেও তার মন পড়ে থাকতো নিজের ঘরে -- দোলনচাঁপার গন্ধ, রাতের খোলা আকাশের নিচে গীটারের সুর আর হরতালের অলস দুপুরগুলোতে।

ইয়া বড় একাটা পেট নিয়ে লজ্জার মাথা খেয়ে কোনোমতে পরীক্ষাগুলো দিলো সে। এর কিছুদিন পরেই নূপুরের কোল জুড়ে এলো রূপকথার ডালিমকুমারের মতোই লাল টুকটুকে এক রাজপুত্র। নিজের ঘরে ফিরে আসলো তারও অনেক পরে, ছেলে একটু শক্তপোক্ত হলে। নূপুর ফিরে আসার পর বাড়িওয়ালী আন্টি খুশিতে বাকবাকুম করতে করতে নতুন মেহমান দেখতে এলো। তার কাছে নূপুর জানতে চাইলো সাজেদার কথা। বাড়িওয়ালী বললো- "তুমি যাওয়ার পর তো তাকে আর দেখি নাই।" 

নূপুরের পীড়াপীড়িতে বস্তি থেকে সাজেদার যে খোঁজ নিয়ে এলো বাড়িওয়ালীর বুয়া, তা হলো - বস্তির ওই ঘরে সাজেদা এখন আর থাকে না, সেখানে অন্য কেউ বাস করছে। নূপুর ভাবলো হয়তো সাজেদার বর তাকে নিয়ে অন্য কোথাও চলে গিয়েছে। কিন্তু তারপরেও সাজেদার বাবুটা কেমন হলো এটা জানার জন্যে নূপুরের ভেতরটা খচ খচ করেই যাচ্ছিলো।

শেষে অনেক কষ্টে সাজেদার স্বামীর সেই দুরসম্পর্কের বোনের নাগাল পেল নূপুর। সেদিন নিজেই চলে গিয়েছিলো সে বস্তিতে। মহিলার কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে, সাজেদার ব্যাপারে জানতে চাইলো? মহিলা নূপুরকে চিনলো। সে বলল - "আপনি যাওনের পর হেরে আমি গার্মেন্টস এ কাম দেই, সেখানে একদিন মাথা চক লাইগা পইড়া গেলো, বাচ্চাটাও গেলো। মেলা দিন খাড়া হইতে পারে নাই, যেখানে-সেখানে পইড়া পইড়া থাকত। তারপর কই যে গেলো, মেলাদিন আর তারে আমিও দেখি না!" 

তার কথা শুনে নূপুর জমে গেলো, কোনমতে জানতে চাইলো - "আর ওর স্বামী?" 

"হেতো সেই কবে ওরে ছাইড়া চইলা গেছে, খালি পরথম দুই মাস এক লগে বস্তিতে আছিলো, তারপর গেছে গ্যা। আপনে জানেন না?!" বিস্ময় ফুটে উঠে তার স্বরে।

নূপুরের মাথায় এবার রক্ত উঠে গেলো, রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে বলল- "তুমি মিথ্যা বলছো কেনো?! সাজেদার স্বামী তো আবার ফিরে এসেছিলো। সাজেদাই আমাকে বলেছে!"

মহিলা এবার অবাক হয়ে বলল - "আমি সত্যই বলছি। সাজেদার স্বামী মরছে, না তারে পুলিশে ধরছে, না অন্য কোনো মাইয়ার লগে বিয়া বইছে আমি জানি না। কিন্তু সে ওই একবারই সাজেদারে ছাইড়া গেছে, আর ফিরে নাই! কেউ তারে আর বস্তিতে ফিরতে দেখে নাই! আপনি হগলরে জিগান!" উপস্থিত অনেকেই তার কথায় সায় দিলো।

প্রায় সাত বছর হয়ে গেলো। নোটবুকে সাজেদার লেখাটা এখনো ঐ একই রকম আছে, গোটা গোটা, স্পষ্ট। জ্বলজ্বলে এ ক'টা শব্দের ভেতর দিয়ে যেন ভেসে ওঠে -- সেই চোখ, সেই বিষণ্ণতা! বেশিক্ষণ তাকাতে পারে না নূপুর এবারো, লেখাটা কেমন ঝাপসা হয়ে আসে। কেন মিথ্যে বলছিলো সাজেদা, এ রহস্য আজো অজানা তার। সে শুধু জানে হারিয়ে গিয়েছে সাজেদা। সাজেদারা হারিয়ে যায়।

--------------------------------------------------------------------------------

কালো গণ্ডার, বিপন্নপ্রায় একটি প্রজাতির নাম!



বর্তমানে আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশী হুমকীর মুখে প্রাণীটি হলো কালো গণ্ডার। এক সময় বিশাল মহাদেশটির বিস্তৃত বনভূমি ও তৃণভূমিতে সাদা-কালো এই দুই প্রজাতির গণ্ডারের অবাধ বিচরণ থাকলেও বেপরোয়া হত্যা, শিকার এবং ব্যাপক চোরাকারবারির কারণে আজ বিপন্নপ্রায় কালো গণ্ডারের অস্তিত্ব। সাদা গণ্ডারও পৌঁছেচে বিলুপ্তির কাতারে। স্বর্ণের চেয়ে দ্বিগুণ দামী গণ্ডারের শিংকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে আফ্রিকায় নৃশংস ও রক্তাত্ব সব চোরাশিকারী যুদ্ধ!


 



সাদা ও কালো এই দুটো প্রজাতিই আসলে হালকা থেকে গাঢ় ধূসর বা বাদামী বর্ণের হয়ে থাকে। এদের মধ্যে তফাৎ করা হয় মূলত মুখের আকৃতি – বিশেষ করে উপরের ঠোঁটের গঠন প্রণালী থেকে। এই ঠোঁটের ভিন্ন গঠন প্রণালীর দরুণ কালো গন্ডারকে ‘hook-lipped rhino’ আর সাদা গণ্ডারকে ‘square-lipped rhino’ নামে ডাকা হয়। বস্তুত ঠোঁটের ভিন্ন আকৃতি চিহ্নিত করে এই দুটি প্রজাতির ভিন্ন খাদ্যাভাসের –- কালো গণ্ডার যেখানে ছোট ছোট ডালপালা, লতাপাতাসমৃদ্ধ গাছ ও ঝোপঝাড় খুঁজে বেড়ায়, সেখানে সাদা গণ্ডার চরে বেড়ায় বিস্তৃত তৃণভূমিতে। জীবনধারণের জন্য পানি এদের কাছে অত্যাবশ্যকীয়, তাই তারা কখনোই পানির খুব বেশি দুরে যায় না। ভোর ও সন্ধ্যা এই দুইবেলায় এরা নিকটবর্তী জলাশয়ে পানি পান করে।



গণ্ডার লম্বায় আফ্রিকান মোষের কাঁধ বরাবর হলেও ওজনে প্রায় এর দ্বিগুণ হয়ে থাকে। এই ভারি-ভরকম শরীর নিয়েও প্রাণীটি ঘণ্টায় ৫০ কিমি পর্যন্ত দৌড়াতে পারে। আর দুর্বল দৃষ্টিশক্তির অনেকটাই পুষিয়ে দেয় এর তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তি। শুধুমাত্র প্রজননের প্রয়োজন ছাড়া গণ্ডার একা থাকতেই পছন্দ করে। প্রজননের জন্য গণ্ডারের কোনো নির্দিষ্ট মৌসুম থাকে না। পুরুষ গণ্ডার মূত্রের ঘ্রাণ থেকে সঙ্গী চিনে নেয়। অর্থাৎ মূত্রের মাধ্যমেই এরা একজন আরেকজনের সাথে যোগাযোগ করে থাকে। সাধারণত পুরুষ গণ্ডার আগন্তুকের প্রতি আক্রমণান্তক হয়ে থাকে।



গণ্ডারের মুখের উপরের অংশে দুটো শিং থাকে, কদাচিৎ কোনোটার তিনটে শিংও দেখা যায়। সামনের শিংটি গড়ে ৬০ সেমি হয়, ক্ষেত্রবিশেষে তা ১৫০ সেমি পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে।



ইউরোপীয় প্রভুদের দ্বারাই আফ্রিকায় গণ্ডারনিধনের সূত্রপাতঃ


বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা তাদের আবাসনের প্রয়োজনে আফ্রিকায় কিছু অবকাঠামোভিত্তিক পরিবর্তনে হাত দেয়, কৃতদাস ও খনিজ ব্যবসার পাশাপাশি আফ্রিকার উর্বরভূমিতে খামার ও পশ্চিমা কায়দায় চাষাবাদ শুরু করে, সাথে কাণ্ডজ্ঞানহীনতার পরিচয়স্বরূপ এখানকার বন্য ঐতিহ্য উজাড়ে প্রাথমিক তৎপরতাও শুরু করে দেয়। ইউরোপীয় সৌখিন শিকারীদের নিছক বিনোদনের তাগিদে সেসময় রোজ গড়ে পাঁচ থেকে ছয়টি গন্ডার হত্যা করা হয়েছে। এরকম বেহিসেবী প্রাণ দিতে হয়েছে হাতি, সিংহসহ অন্যান্য বন্যপশুকেও। অবশ্য হাতির দাঁতের কারবার ইউরোপীয় বণিকরা শুরু করে দিয়েছিলো তারও বহু আগেই। অর্থাৎ সামন্তপ্রভুদের রেখে যাওয়া বিনাশের এ মাত্রা ছিলো সম্পূর্ন অপূরণীয়।

গণ্ডারের শিঙের চোরাকারবারি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়াঃ



শিকার ও হত্যার পাশাপাশি আফ্রিকান হাতির দাঁতের সাথে গণ্ডারের শিঙেরও চোরাকারবারির রাজত্ব শুরু হয় ষাটের দশকের শেষে ও সত্তুরের দশকের শুরু থেকে। অনুমান করা হয় ইউরোপিয়ানদের দ্বারা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের পরেও সেসময় মহাদেশটিতে ৭০,০০০ এর মতো জীবিত কালো গণ্ডার ছিলো। প্রাপ্ত তথ্যমতে - সত্তুর দশকের শুরু থেকে এই পোচিং মোটামুটি মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে এবং আশির দশকের মধ্যেই প্রাণীটির সংখ্যা স্থানভেদে শতকরা ৪০ থেকে ৯০ ভাগ পর্যন্ত কমিয়ে আনে। কেবল মাত্র ১৯৭০ থেকে ১৯৯২ সালের ভেতর পুরো আফ্রিকায় সমগ্র কালো গণ্ডারের ৯৬ ভাগই মেরে সাফ করা হয়।




কলোনি পরবর্তী অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অভ্যন্তরীণ জাতিগত সংঘর্ষ এবং আফ্রিকার নানাদেশে চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে বিশাল এ মহাদেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে এন্টি-পোচিং কার্যক্রমও তুলনামূলক শ্লথ গতিতে এগিয়ে চলছে। এবং বেশীরভাগ স্থানেই সংরক্ষণের প্রক্রিয়াকে নিত্য বাধার মুখে পড়তে হয়। উদাহরণস্বরূপ – এঙ্গোলা, রুয়ান্ডা, সোমালিয়া, সুদানের মত জাতিগত দাঙ্গা ও গৃহযুদ্ধে জর্জরিত দেশগুলোতে বন্যজীবন সংরক্ষণের মত কার্যক্রম পরিচালনা করা রীতিমত দুঃসাধ্য ব্যাপার। ফলে এই পোচিং ও চোরাকারবারিদের দৌরাত্ব অভুতপূর্বভাবে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। যে কারণে প্রানীটির সংখ্যা কমতে কমতে আফ্রিকার বিভিন্ন প্রান্ত যেমন- পশ্চিম আফ্রিকায় ইতিমধ্যে কালো গণ্ডার সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন ঘোষণা করা হয়েছে।



বর্তমানে আফ্রিকায় জীবিত গণ্ডারের সংখ্যা ও সংরক্ষণঃ


বর্তমানে আফ্রিকায় বিশ হাজারের মত সাদা গণ্ডার এবং মাত্র পাঁচ হাজারেরও কম কালো গণ্ডার অবশিষ্ট আছে। যার মধ্যে ৯৮ ভাগই কেবলমাত্র -- সাউথ আফ্রিকা, নাবিবিয়া, জিম্বাবুয়ে ও কেনিয়া এই চারটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অনেকসময় চোরাকারবারিদের হাত থেকে রক্ষার জন্যে তাদের সরিয়ে নেয়া হয় সংরক্ষিত স্থানগুলোতে। যেখানে ডেভিড শেল্ড্রিকের ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্টের মত গুটিকয়েক কনজারভেশন সেন্টার, ন্যাশনাল পার্কগুলোতে এই বিপন্নপ্রায় প্রাণীটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ‘দুর্বল প্রয়াস’ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ‘দুর্বল প্রয়াস’ কথাটা বলার কারণ হলো - সংরক্ষিত এরিয়াগুলোতেও গন্ডার ও হাতির মত মূল্যবান প্রাণী দুর্বিৃত্তদের হাত থেকে রক্ষা করতে বনরক্ষক, কর্মীদের রীতিমত হিমশিম খেতে হয়।



 কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টা গান প্রটেকশনে রেখেও তাদের রক্ষা করা দায় হয়ে পড়ে। কখনো সংরক্ষণ কর্মীদের সাথে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত দুর্বিৃত্তদের সংঘর্ষ এবং মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে থাকে। এছাড়াও রাতে চাঁদের আলোয় চোরাহত্যা, গুপ্তহত্যা ইত্যাদি নৃশংসতা তো ঘটছে হরহামেশাই। 





গণ্ডারের শিঙের এই ব্যবসা এতটাই লাভজনক যে হাতির দাঁতের মত এটা সংগ্রহের জন্যেও সুসংগঠিত চোরাকারবারির আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যাতে প্রত্যক্ষভাবে ইন্ধন যুগিয়ে যাচ্ছে আমেরিকার মত শক্তিধর দেশগুলো। ফলে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির হেলিকাপ্টার থেকে শুরু করে, রাতে দেখা যায় এমন বাইনোকুলার, সাইলেন্সড গান, বিষাক্ত বা অচেতন করার ওষুধ এবং অন্যান্য দুষ্প্রাপ্য অস্ত্রপাতি সহজলভ্য করে পৌঁছে দেয়া হয় আঞ্চলিক দুর্বিৃত্তদের হাতে। অর্থাৎ আফ্রিকার বনঐতিহ্য উজাড়ে একটি বড় দায়ভার বর্তায় আমেরিকার মত সুবিধাবাদী রাষ্ট্রের উপরও।

তাই নির্লজ্জ বাস্তবতা হলো – শত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কালো গণ্ডারের মত ঐতিহ্যবাহী অসাধারণ এই প্রাণীটির শেষ রক্ষা হয়ত সম্ভব না। সম্প্রতি কয়েক বছরে আফ্রিকার কালো গণ্ডার হত্যার ক্রমবর্ধমান চিত্রটি অন্তত তাই বলে –
২০০৯ সালে হত্যাকৃত গন্ডারের সংখ্যা ছিলো – ১২২ টি
২০১০ সালে হত্যাকৃত গন্ডারের সংখ্যা ছিলো – ৩৩৩ টি
২০১২ সালে এপর্যন্ত গন্ডার হত্যার সংখ্যা – ৩৮৮ টি (যা এরই মধ্যে বিগত কয়েক বছরের গন্ডার হত্যার সংখ্যা ছাড়িয়ে গিয়েছে!) 


কেবলমাত্র যে শিঙের জন্য আস্ত একটা প্রজাতিই বিলুপ্ত হতে বসেছে, এবার দেখা যাক সেই সিঙের প্রকৃত গুরুত্ব ও মহত্ত্বঃ




এরকম একটা শিঙের ওজন আট পাউন্ডের মত। এবং যার কালোবাজারি দাম ৩৬০,০০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে! (আতর্জাতিক ইন্ধন তথা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ও মূল্যবান অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহারের কারণটা মোটামুটি এখানেই পরিষ্কার। ব্যাপক হারে গণ্ডার নিধন বস্তুত মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলারের মামলা!)




গণ্ডারের শিঙের সবচেয়ে বড় বাজার দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার প্রধাণত চায়না ও ভিয়েতনাম, যেখানে এই শিং-কে অত্যন্ত কার্যকরী ঔষধিগুনসমৃদ্ধ একটি মূল্যবান উপাদান হিসেবে মনে করা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ বছরের প্রচলিত বিশ্বাসমতে গন্ডারের শিং থেকে প্রাপ্ত পাউডার মাথাব্যথা, জ্বর, হৃদরোগ এবং কান্সারের মত অসুখ সারাতে সক্ষম।

অথচ যেখানে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, গণ্ডারের শিঙ keratin নামের প্রোটিন দিয়ে গঠিত, একই কেরাটিন যা আমাদের নখ ও চুলেও বিদ্যমান। এবং যার মধ্যে কোনো প্রকার রোগ নিরাময়ের ঔষধি গুণাবলীর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায় না!

অতএব শুধুমাত্র ভ্রান্ত ধারণা আর বিশ্বাসই গণ্ডারের শিঙের মত খুব সাধারণ একটি বস্তুকে মানুষের কাছে করে তুলেছে অমূল্য! এবং যার বলি হতে হয়েছে পুরো সমৃদ্ধ এক প্রজাতিকে। মানষের নির্বুদ্ধিতা, অজ্ঞতা এবং নৃশংসতার মূল্য না জানি এরকম কত প্রজাতিকে ইতোমধ্যে দিতে হয়েছে এবং রোজ কত নতুন প্রজাতি এ কাতারে যোগ হচ্ছে, সে হিসেব নিঃসন্দেহে ভয়াবহ!

যদিও আপাতদৃষ্টিতে চায়নায় আইনের মাধ্যমে তাদের ঐতিহ্যবাহী ঔষধপত্রে গন্ডারের শিং ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তারপরেও পরিসংখ্যান বলছে অন্য কথা - পোচিং চলছে দেদারসে, বরং পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়েও আরো জোরেসোরে। এ প্রবণতা এতটাই আশংকাজনক যে, যদি এখনই বন্ধ না হয় তবে পৃথিবী অচিরেই হারাবে আফ্রিকান কালো গণ্ডার, প্রকৃতি হারাবে তার আরেক বিশাল প্রজাতি, এবং একের পর এক এই মনুষ্যসৃষ্ট বিলুপ্তি আমাদের নিজেদের কপালে কি দুর্ভোগ বয়ে আনবে তা হয়ত আমারা এখনো অনুমানও করে উঠতে পারি নাই!
------------------------------------------------------------------------------------------------------
তথ্য ও ছবি সূত্রঃ

ডাব্লিউ ডাব্লিউ এফ গ্লোবাল
বিবিসি
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
 ইউকিপিডিয়া
স্টার আফ্রিকা
ভণ্ডুল


তুলতুলে গা হাতির ছানা!


EVERY PERSON THAT BUYS IVORY HAS BLOOD ON THEIR HANDS AND IS AN ACCOMPLICE IN KILLING AN ELEPHANT, CAUSING IMMEASURABLE SORROW AND SUFFERING TO MANY OTHERS. SAY NO TO IVOY!
কেনিয়ার বন্যজীবন সংরক্ষণে কিংবদন্তি হিসেবে যে মানুষটির নাম সবার আগে আসে তিনি হলেন ডেভিড শেলড্রিকমাত্র একটি লরি ও অল্প কিছু শ্রমিক নিয়ে যিনি দুর্গম, খরাপূর্ন, ভয়ংকর হিংস্র পশু (প্রধানত সিংহ) ভরা, অজানা-অদেখা কেনিয়ার পূর্বাঞ্চলে প্রথম বনরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৪৮ সাল থেকে। যা বর্তমানে কেনিয়ার সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত – Tsavo National Park (‘দ্যা ঘোস্ট’ এবং ‘দ্যা ডার্কনেস’ সিংহদু’টির আবাসভূমি) নামে পরিচিত।



তিনি যখন প্রথম এ অঞ্চলটিতে আসেন তখন না ছিলো এখানে যোগাযোগের জন্য কোনো রাস্তা, না ছিলো বসবাসের জন্য উপযুক্ত কোনো পরিবেশ। হিংস্র পশু ও খরায় কবলিত অঞ্চলটি ছিলো সবদিক থেকে ঝুঁকিপূর্ন। কিন্তু তারপরেও শেলড্রিকের মত মানুষের প্রকৃতির প্রতি দুর্বার আকর্ষনই তাকে এখানে টিকে যেতে সাহায্য করেছিলো। সাথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করেছিলো প্রায় ৫,০০০ বর্গমাইল বিশাল এই অঞ্চলটিকে শুধুমাত্র বন্যজীবনের অভয়ারণ্যের পরিণত করতে। পাহাড় সমান অসাধ্য সাধন করে তিনি এ অঞ্চলটিতে যাতায়াতের উপযোগী রাস্তা, বন্যপ্রাণীদের খরার হাত থেকে রক্ষা করতে বর্ষাকালীন নদীতে বাঁধ ও পানি ধরে রাখতে মনুষ্যসৃষ্টি লেক ‘অরুবা’ নির্মাণ করেন, যার ফলে অসংখ্য হাতি, গণ্ডার ও অন্যান্য প্রানী এই জীবনের উৎস পানিটুকুর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ভালোবেসে ফেলেছিলো সে এই প্রাণীগুলোকে, তাদের কষ্ট-দুর্দশার সাথে জড়িয়ে পড়েছিলো খুব সহজেই। যে কারণে চরম খরার কবলে পরে অথবা মানুষ ও হিংস্র প্রাণীর আক্রমনের শিকার হয়ে মুমূর্ষু অবস্থার প্রানীকে এবং মা-হারা এতিম ছানাগুলোকে খাদ্য-পানি-আশ্রয় দিয়ে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যেত, আর এ সব কিছুতেই পাশে থেকে তাকে শক্তি ও সাহস যুগিয়েছিলো স্ত্রী ড্যাফন । একটানা ২৪ বছর এখানে ক্লান্তিহীন দায়িত্ব পালনের পর শেলড্রিকের বদলি হয় এবং তার ঠিক ছয় মাস পর ১৯৭৭ সালে হঠাৎ মানুষটির জীবনও যেন সব গতি হারিয়ে ফেলে!

শেলড্রিকের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী ড্যাফন স্বামীর সেই মহৎ উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিকতায় রূপ দেয় The Devid Scheldrik’s Wildlife Trust এর মাধ্যমে। শেলড্রিকের স্বপ্নকে জিইয়ে রাখতে প্রায় দুই দশকেরও বেশী সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে ব্যাপক পোচারিং এর কারণে আফ্রিকার সবচেয়ে বেশী হুমকির সম্মুখীন হাতি, কালো গণ্ডার সংরক্ষণের। আওতায় আছে অন্য বন্যপ্রাণীও। এতিম, বিছিন্ন ছানাগুলোর একটি নিরাপদ আশ্রয়ে বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে চালু করাহয় এই নার্সারিগুলোর। যেখানে মুক্ত পরিবেশে এতিম শাবকগুলোর লালন-পালন করা হয়। নির্দিষ্ট বয়সের পর তাদের ছেড়ে দেয়া হয় সাভোর মতো বড় ন্যাশনাল পার্কগুলোতে।



আমার ছেলের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর, আদুরে, পুতুপুতু প্রানী হলো হাতি। তার নিজের একটা পোষা হাতির শখ অনেক দিনের। তার মতে হাতির সাথে বন্ধুত্ব করাও নাকি খুব সোজা বিষয়, শুধু দু-একটা চিনে বাদাম ওটার সামনে ধরলেই, সে শুঁড় দিয়ে সুরুত করে তা টেনে নিয়ে, আনন্দে লাফাতে লাফাতে বন্ধু হয়ে যাবে (আইডিয়া টা যে ‘টম অ্যান্ড জেরী’ থেকে নেয়া এটা বুঝতে আমার বাকি থাকেনা)। এরপরের প্ল্যানিং অবশ্য দীর্ঘ - টারজানের মত যত খুশি হাতির পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ানো, শুঁড়টাকে হোস পাইপ বানিয়ে গাছে পানি দেয়া, ট্রাম্পেটের আওয়াজ দিয়ে দুষ্টুদের ভয় দেয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। তার ধারণা অন্যসব পশু-পাখি যেমন- কুকুর, বেড়াল ইত্যাদির মত হাতিও চাইলেই জোগাড় করা যায়। এটা আর এমন কি, কেনিয়ার এলিফ্যান্ট অরফানেজে এতগুলো বেবি এলিফ্যান্ট আছে সেখান থেকে একটা নিয়ে আসলেই তো হয়।



শুধু ছেলের দোষ দেই কেন, আমার নিজেরও প্রাণীকূলের মধ্যে হাতির প্রতি দুর্বলতা বরাবরই একটু বেশী। আর তা যদি হয় বাবু হাতি, তাহলে তো কথাই নাই! আমার তো মনে হয় এই বিশাল অদ্ভুত সুন্দর প্রাণীটির ভেতরে শিশুর মতো যে সরলতা আছে তা দেখে একে ভালো না বেসে থাকতে পারাটাই হবে এক আশ্চর্য।



শিশু হাতিগুলোর প্রাণোচ্ছল ছেলেমানুষি দেখে ওদের সাথে মানবশিশুর পার্থক্য করা রীতিমত কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাদের দুরন্তপনা, খুনসুটি, মান-অভিমান, আনন্দে আত্নহারা হয়ে খেলায় মেতে যাওয়া এ সবের সাথে আমার নিজের কোলের শিশুটির আচরণের আমি আসলেই কোনো তফাৎ করতে পারি নাই। তাই ওদেরও দেখেছি একই মুগ্ধতা নিয়ে, মন ভরে উঠেছে গভীর অথচ খুব চেনা এক মমতায়, যা আমি অনুভব করি আমার নিজের সন্তানের প্রতি।



শিশুদের খাওয়ার দৃশ্য নিঃসন্দেহে পৃথিবীর স্বর্গীয় মুহুর্তগুলোর একটি!



 আর স্বর্গীয় এ মুহূর্তটি দেখতে হলে নাইরোবির ডেভিড শেলড্রিক’স এলিফান্ট অরফানেজ এ অবশ্যই সকাল ১১টার মধ্যে যেতে হবে। সেসময়টি এই দেবশিশুগুলোর খাওয়ার সময়। অরফনেজটির মুক্ত পরিবেশে তারা বয়েস ভেদে কয়েক গ্রুপে ভাগ হয়ে একটি নিরাপদ আশ্রয়ে সাচ্ছন্দে বেড়ে উঠে। খাওয়ার জন্য একেক বার একেক দলকে ডেকে আনা হয় জঙ্গল থেকে। অদ্ভুত সুশৃঙ্খল নিয়মে শিশু হাতিগুলোর একেকটি দল একদিক থেকে এসে খেয়ে খানিকক্ষণ হুটোপুটি করে খেলে অন্যদিক দিয়ে আবার জঙ্গলে চলে যায়। এরপর ডাকা হয় আরেক দলকে।



সকাল ১১ টায় প্রথম গ্রুপের বাচ্চা হাতিগুলোকে আনা হচ্ছে খাওয়ানোর জন্য।



দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখে সহজে অনুমান করা যায়, এই মুহূর্তগুলো কতটা অপার্থিব তৃপ্তিদায়ক, কতটা দুর্লভ! 

আমি বাজি রেখে বলতে পারি, কেউ যত পাষাণ হৃদয়ের হোক না কেন কেবল ছবিগুলো দেখেই ওদের ভালোবেসে ফেলবে। এই অকৃত্রিম নির্মল আকুতিই যথেষ্ট কেউ না চাইলেও তার মনকে ঠিকই টেনেহিঁচড়ে নিয়ে ওদের সাথে কোথাও এক অদৃশ্য বাঁধনে জড়াতে! আমরা বাধ্য ওদের ভালবাসতে! তারপরেও কেউ যদি অস্বীকার করে তাহলে বলব, আপনি নির্ঘাত হৃদয়ের সব অনুভূতিসমেত আস্ত হৃদয়টাকেই লকারে পুরে তালা মেরে রেখেছেন!



অনুভূতির দিক থেকে হাতি মানুষের সমমানের এক প্রাণী


হাতির অনুভূতি ব্যাপারে কিছু তথ্য জেনে ভীষণ অবাক হয়েছি। মানুষের সাথে এই প্রাণীটির অনুভূতির কতখানি মিল, তা আসলেই ভাবা যায় না। মানুষের মতই তার হৃদয়ও কোনো অজানা রহস্যময় অথচ গাঢ় জ্যোতিতে ভরা। যেখানে সুখ-দুঃখ, অস্থিরতা-প্রশান্তি, রাগ-ঈর্ষা-ক্রোধ-হিংস্রতার অদ্ভুত সংমিশ্রণ, তারা চাইলে আমাদের মতই তাদের এই অনুভূতিগুলো বিকশিত অথবা সীমাবদ্ধ রাখতে পারে। তাদের মধ্যে রয়েছে দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন, প্রিয়জনের প্রতি ভালোবাসা, শুধু তাই নয় ভালোলাগার স্মৃতি বা বিষয়গুলো তারা হৃদয়ে ধরে রাখে আজীবন। প্রিয়জনের মৃত্যু বা বিচ্ছেদে তারা কষ্ট পায়, কাঁদে, উন্মাদ হয়ে যায়। আবার কখনো অবসরে সেই স্মৃতি হাতড়ে অতি আপনজনটির অনুপস্থিতি অনুভব করে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলে, ঠিক যেন মানুষেরই মত!

-একটি হাতি’র মস্তিষ্কে জমানো স্মৃতি (হতে পারে তা সঙ্গী অথবা প্রিয়মানুষ, বিষয় বা ঘটনা) তার জীবনকাল থেকে যায়।

-হাতির শ্রবণশক্তি মানুষের চেয়ে ঢের গুণ বেশি তীক্ষ্ণ! তারা নিজেদের মধ্যে দীর্ঘ পরিসরে অদৃশ্য কিছু শব্দে যোগাযোগ করে, যা মানুষের পক্ষে কখনই শোনা বা জানা সম্ভব নয়। অর্থাৎ হাতি তার চারপাশের যেকোন ছোট থেকে ছোট শব্দ অনেক দুর থেকে শুনতে পায়।


অতএব কেবল আকারেই নয়, বরং প্রচণ্ড ভালোবাসার ক্ষমতাসম্পন্ন এবং তীক্ষ্ণ অনুভূতিপ্রবণ এই প্রাণীটি প্রকৃতির শর্তাবলি অনুযায়ী বাস্তবেই পৃথিবী নামক এই গ্রহটার সবচেয়ে বড় স্তন্যপায়ী জীব।

অথচ নগ্ন সত্য হলো, শুধুমাত্র এর মূল্যবান দাঁতের কারণে হাতি মানুষের বর্বতার শিকার হয়ে আসছে বহু আগে থেকেই। ধারণা করা হয় বর্তমানে আফ্রিকায় মাত্র ৫ লাখের মত হাতি অবশিষ্ট আছে। যারমধ্যে কমপক্ষে দশ হাজার হাতি প্রতি বছর বলি হচ্ছে চোরাকারবারি, শিকারি অথবা আইভরি ব্যবসায়ীদের নৃশংসতার। ব্যাপক হারে পোচিং-এর শিকার আফ্রিকান হাতির উপর চালানো ভয়ঙ্কর সব গণহত্যা বর্তমানে প্রাণীটির অস্তিত্বই হুমকির মুখে এনে ঠেকিয়েছে। এই প্রক্রিয়া এতটা নৃসংশ যে তা বীভৎসতার সংজ্ঞাকেও হার মানায়, যখন একটি পালের (ছোট-বড়) সব ক’টা হাতিকে একসাথে হেলিকাপ্টার থেকে ব্রাশ ফায়ারিঙে গণহারে হত্যা করা হয়। অথবা স্থানীয় আদিবাসীদের দ্বারা বিষাক্ত তীর ছুড়ে মারা হয়। উদ্দেশ্য মূলত একটাই নিরীহ এই প্রানীটি থেকে খুবলে নেয়া দাঁতের রমরমা বানিজ্য। যত বেশি মরা হাতি, তত বেশি দাঁত, তত বেশি টাকা! জয় মানবপ্রজাতি! জয় তোমার বীরত্ব! প্রকৃতিকে বোধ করি এই এক মানব প্রজাতির হিংস্রতা ও বর্বরতার মূল্য দিতে দিতেই ক্রমে কঙ্কালসার হতে হবে, যথারীতি যার খেসারৎ দিচ্ছে এরকম মহান সব সৃষ্টি!

উল্লেখ্য, অসহায় প্রানীগুলোর উপর চালানো পাশবিক বর্বরতায় ব্যবহৃত হেলিকাপ্টার থেকে শুরু করে আধুনিক মিলিটারি অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য ইন্ধনগুলো আঞ্চলিক ক্লায়েন্টদের হাতে ট্রাষ্টের নামে মূলত পৌঁছে দিয়ে আসছে ইউনাইটেড স্টেটেস মত ক্ষমতাধর দেশগুলো! কিন্তু কেন এই ট্রাস্ট? কি উদ্দেশ্যে এগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে? সে ব্যাপারে তারা বরাবরই “comfortably numb” ! অতএব আফ্রিকার বন ঐতিহ্য উজাড়ে একটি বড় দায়ভার আমেরিকার মত পশ্চিমা সুবিধাবাদী রাষ্ট্রগুলোর উপরও বর্তায়।

যদিও হাতির দাঁতের এই বানিজ্য দুই দশক যাবত আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ। তারপরেও ধর্মীয় কারণে আইভরি বাণিজ্যের সবচেয়ে বড় বাজার চায়নাসহ থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামের বাজার রয়েছে এখনো উন্মুক্ত এবং আমেরিকার মত শক্তিধর দেশেগুলোর দুর্বৃত্তদের মদতে এই নৃশংস পোচিংও চলছে যথারীতি সক্রিয়ভাবে। এ প্রক্রিয়া যদি এভাবেই চলতে থাকে তাহলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই প্রকৃতির সবচেয়ে বৃহৎ ও অসাধারণ এই সৃষ্টিটি পুরোপুরি বিলুপ্তির কাতারে পৌছে যাবে এব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। খোলা অরণ্যে হাতির বিচরণ রূপকথার গল্প হয়ে থাকবে, হয়ত দেখা মিলবে চিড়িয়াখানা অথবা ডেভিড শেলড্রিকদের মতো মানুষদের মনুষ্যত্বের উদাহরণস্বরূপ রেখে যাওয়া কনজারভেশন সেন্টার, অরফানেজগুলোতে। যেগুলোতে গেলে প্রকৃতির সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রাণী হিসেবে মানুষ হওয়ার লজ্জাটা কিছুটা হলেও ঘুচে।

............................................................................................................

 অফ টপিকঃ ফেসবুকে The Devid Scheldrik’s Wildlife Trust পেজটি এড করে এই ছানাপোনাদের নিয়মিত খোঁজখবর পেতে পারেন। আবার চাইলে এখানে ডোনেট করে এই মহৎ প্রক্রিয়ার অংশীদার হতে পারেন।

-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------

সাফারি সাফারি...





প্রথম আফ্রিকায় এসে এখানকার বন্য জীবন ঘুরে দেখার বহুদিনের লোভ সামলাতে না পেরে সে বছর ডিসেম্বরেই সোজা রওনা হলাম পাশের দেশ সেনেগালে। নভেম্বর থেকে মার্চ এই সময়টাকে এখানে বলা হয় টুরিস্ট সিজন। সেসময় প্লেন বোঝাই হয়ে দলে দলে ভ্রমণ পিপাসুরা আসে এখানকার বনজঙ্গল চড়ে বেড়াতে, তাদের মধ্যে পশ্চিমা সাদা চামড়া বা লোকালদের ভাষায় 'টুবাব' এর সংখ্যাই বেশি। আফ্রিকার বন্যজীবন ছাড়াও, এ অঞ্চলের দাসত্বের ইতিহাস ও আটলান্টিকের আকুল আবেদন তো আছেই বাড়তি পাওনা হিসেবে। অন্যদিকে লোকালদের কাছে টুরিস্ট সিজন মানেই টু-পাইস কামাইয়ের মোক্ষম সুযোগ। পথে ঘাটে সব খানেই দেখা যায় লোকে আফ্রিকান স্যুভেনিরের পশরা সাজিয়ে বসে। এসব অঞ্চলের বিড'স শিল্প, উডেন শিল্প, রঙ্গিন বাটিকের কাপড়, ক্যাশুনাট ইত্যাদি বিখ্যাত জগৎ জুড়ে। তা নিয়ে সময় করে আলাদা আলোচনা হতে পারে।



সেনেগাল, 'দা ফ্রেঞ্চ কোস্ট অফ আফ্রিকা'-য় আমাদের নির্ধারিত চার দিনের মধ্যে তিন দিনই পার হয়ে গেলো - গোরে আইল্যান্ড, মেইজন দি এসক্লাভস, রাজধানী ডাকার এ। চতুর্থদিন সকাল সকাল ভাড়া করা ল্যান্ড রোভার নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম, উদ্দেশ্য অবশেষে সাফারি। ল্যান্ড রোভার কেন - আফ্রিকার দুর্গম গিরি কান্তার মরু টাইপ পথ পাড়ি দেয়ার জন্য বিশেষভাবে বানানো অত্যন্ত রোবাস্ট ফোর হুইলার হলো এই গাড়িগুলো। যে কারণে এ অঞ্চলে ছোট মারুতির চেয়ে তুলনামূলক এইসব উঁচু ফোর-হুইলারগুলো বেশী জনপ্রিয়। বনে বাদাড়ে বিশাল বিশাল দৈত্যাকৃতির গাড়ির আধিক্য দেখে মনে হবে, এখানকার মানুষেরা সবাই বুঝি খুব ধনী, বাংলাদেশের মন্ত্রী মিনিস্টারদের মত। আসলে বিষয়টা মোটেও সেরকম না, দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এখানকার অধিকাংশ মানুষের গাড়ি ব্যবহারের সামর্থ্য নেই বললেই চলে। তারপরেও জীপ, চেরোকি, ডিফেন্ডার, হামার, লান্ড রোভার, ল্যান্ড ক্রুজারের মত গাড়িগুলো মূলত আসে এখানে ঘুরতে আসা সৌখিন টুরিস্টদের বা বিভিন্ন গবেষণায় আসা দাতা সংস্থাগুলোর বদৌলতে। যেহেতু এখানে গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে ট্যাক্স নেই বললেই চলে, তাই অনেকে আফ্রিকা ভ্রমণে শিপিং এ নিজের গাড়ি নিয়ে আসে, সেই গাড়ি করে আফ্রিকার কয়েক হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে, যাবার সময় নিলামে প্রায় পানির দরে তা বিক্রি করে দিয়ে যায়। কারণ উন্নত দেশগুলোতে তেলখাদক বড় গাড়িগুলো পোষায় অনেক হ্যাপা।



আমাদের ল্যান্ডরোভার ছুটে চলেছে, খানা-খন্দ পেরিয়ে, পথের লাল ধুলো উড়িয়ে। দুপাশে পানির অভাবে শুকিয়ে খর হয়ে আসা বিবর্ণ মরা ঘাসের মাঠ। কোথাও কোথাও তা লম্বায় বুক ছাড়িয়ে গিয়েছে, থেকে থেকে বাতাসে দুলে উঠছে যেন পৌষে নবান্নের আগে ছড়িয়ে থাকা আদিগন্ত সোনালি ধানক্ষেত, তার মাঝে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে প্রকান্ড বিচিত্র আকৃতির ভুতুড়ে বাওবাবগুলো। যেগুলোকে 'শয়তান খেয়ালবশতঃ মাটি থেকে তুলে উল্টো করে পুঁতে রেখেছে, আর তাদের শেকড়গুলো ছড়িয়ে আছে আকাশে।' ঝোপ-ঝাড় বন-জঙ্গল যাই পেরিয়ে যাচ্ছি সবখানেই একই বৈচিত্র্যহীন ধুসর বাদামী, কোথাও বা ধুলো জমা লালচে প্রাণহীন সবুজ। মনের ভেতরে থাকা 'ঘোস্ট এ্যন্ড দা ডার্কনেস' অথবা 'গড মাস্ট বি ক্রেজি'-র আফ্রিকার সেই চেনা পটভূমির সাথে হুবহু মিলে যায় সবকিছু। পরে জেনেছি এখানে পুরো বছর ধরে খেলে যায় শুধুমাত্র দুটি ঋতু - 'রেনি সিজন' ও 'ড্রাই সিজন'। এবং এই প্রানহীন ধুসর প্রান্তর বর্ষার এক পরশেই কেমন আশ্চর্য রকমের সবুজ ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে তা নিজ চোখে না দেখলে ঠিক বিশ্বাস করা কঠিন!







বলা বাহুল্য আমাদের ল্যান্ডরোভারখানা সাইজ ও স্বভাবে পদে পদে এখানকার পরিবেশ অ্নুকূলতার প্রমাণ দিচ্ছে, অথচ এটার ভেতরে আমাদের অবস্থান মোটেও সেই তুলনায় অনুকূল হয়ে উঠছিলো না, তার উপর মাঝের কিছু রাস্তা ছিলো যাকে বলে এক্কেবারে 'রিয়েল ওয়াইল্ড'! আহা! সেই কথা মনে পড়লে এখনো কোমরের পেশীতে টান অনুভব করি! গাইডের নির্দেশে কাঁটাবনের ভেতর দিয়ে যাওয়ার পথে, বেখেয়ালে জানালা খুলে রাখায় বিষাক্ত কাঁটাওয়ালা ডালের অবাঞ্ছিত প্রবেশে মুখের মানচিত্র হেরফেরের হাত থেকে একটুর জন্যে বেঁচে যাই, পরম করুণাময়ের কৃপায়! এটা ভেবে এখনো শান্তি পাই যে সেযাত্রা অক্ষত ফিরতে পেরেছিলাম! এভাবে এক থেকে দেড়ঘন্টার যত্রতত্র ঘুরার পর, মনে হচ্ছিলো আশপাশের প্রাণীরা বোধহয় আমাদের আসার খবর পেয়ে, আগেভাগেই সব লুকিয়ে বসে আছে, আদৌ কিছু দেখা পাব কিনা সন্দেহ। ঠিক এমন সময় গাইড হাত দিয়ে ড্রাইভারকে গাড়ি থামানোর ইশারা করলো, আমাদের এক লম্বা কাঁটাঝাড়ের আড়ালে কিছু দেখালো। দেখলাম লম্বায় প্রায় গাছের সমান এক জিরাফ। আমরা ধীর পায়ে গাড়ি থেকে নেমে এলাম, আমাদের দেখে তাকে খুব একটা ভীত বা অস্থির মনে হলোনা, খুব স্বাভাবিকভাবেই সে গাছের পাতা খেয়ে যাচ্ছে। আমরা মুগ্ধ জীবনে প্রথম এই বিশাল, অদ্ভুত সুন্দর ও মায়াভরা চোখের প্রাণীটিকে বাস্তবে এত কাছ থেকে দেখতে পেয়ে! যেখানে কোনো লোহার শিক দিয়ে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি তার বিচরণক্ষেত্র, আমার মত সেও সমান স্বাধীন। যেন ডিসকভারি বা অ্যানিম্যাল প্ল্যানেটের কোনো ওয়াইল্ড লাইফ নিয়ে ডকুমেন্টারি-তে দুম করে নিজেই ঢুকে পড়েছি!



প্রাণীটি শুধু দেখতেই নিরীহ নয় স্বভাবেও মিশুক প্রকৃতির। ছবি নেয়ার সময় ঘাড় ঘুড়িয়ে আমাদের অবাক করে কেমন পোজ দিলো! জিরাফের লম্বা গ্রীবা ও বড় বড় চোখ দিয়ে সে চারপাশ বেশ ভালোই দেখে। শিকারির আক্রমন থেকে রক্ষার জন্যে সে ঘণ্টায় ৬০ কিমি পর্যন্ত দৌড়াতে পারে। তার পেছনের পায়ের জোর এতোই প্রবল যে শুধু মাত্র এক কিকই যথেষ্ট সিংহ মামাকে কুপোকাত করতে, যদি তা ঠিক মত বসাতে পারে। জিরাফ এমন একটা প্রাণী যে কিনা দাঁড়িয়ে চোখ খোলা রেখেই ঘুমায়! আবার জিরাফের সবচেয়ে প্যাথেটিক বিষয়টিও কিন্তু পা, এই ৬/৭ ফুট উঁচু পায়ের কারণেই এদের অধিকাংশ বাচ্চা জন্মাবার পর মাটিতে আছাড় খেয়ে ঘাড় ভেঙ্গে মারা যায়!





জেব্রাগুলোকে দেখতে সব একই রকম মনে হলেও, পৃথিবীর সব প্রাণীর ডি এন এর গঠন যেমন আলাদা, আমাদের আঙ্গুলের ছাপ, সিগনেচার এমনকি মায়েদের হাতের রান্নাও যেমন একটার থেকে আরেকটা মিলানো যায় না, তেমনি প্রতিটি জেব্রার গায়ের সাদা কালো ছাপগুলোও একটির থেকে আরেকটি আলাদা। জিরাফ বা অন্য যেকোনো প্রাণীর ক্ষেত্রও এটা প্রযোজ্য।



গণ্ডারের চামড়া ওয়ালা রিয়েল গণ্ডার মামু, আমাদের যা লুক দিয়েছিলো তা দেখে ভয়ে জমে যাবার মত অবস্থা, এখুনি তেড়ে এসে আস্ত গাড়িটাই উল্টায়ে দেয় কিনা ভাবছি, গণ্ডারের শক্তি বলে কথা! গাইড বলল, 'ডোন্ট ওরি! সে তার দৃষ্টি সীমার দু-তিন ফিটের বাইরে তেমন কিছুই দেখে না।' শুনে তাইরে নাইরে করে গাড়ি থেকে নেমে (নিরাপদ দুরুত্ব বজায় রেখে) বীরের মত মুখে হাসিআলা পোজ দিয়ে গণ্ডারের সাথে ফটো তুললাম।





গণ্ডারকে বিদায় দিয়ে কিছুদূর এগোনোর পর ছানাপোনাসমেত এক উটপাখী যুগল দেখে আমাদের চোখ ছানাবড়া। দুমকি চালে খুব আয়েসে হেঁটে যাচ্ছে তারা আমাদের ঠিক সামনে দিয়ে, গাড়িটাকে সাইড দেয়ার ইচ্ছা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না এই পরিবারের। আমাদেরও তাড়া নেই, ওদের দেখেই তো আমাদের পয়সা উসুল! তাছাড়া বনে তো বন্যদের অগ্রাধিকার বেশি হওয়া উচিৎ।






শ্রী গনেশ বাওবাব। হাতির মাথার আকৃতির এই বাওবাবটিকে বলা হয়, 'এলিফ্যান্ট বাওবাব'।





প্রাচীন বাওবাব বৃক্ষ ঘিরে এ অঞ্চলে চিরকাল নানা প্রথা বিদ্যমান। এক সময়ের 'স্টোরি টেইলার' নামে পরিচিত সন্মানিত পবিত্র কিছু ব্যক্তিত্ব ছিলো, তারা বিশ্বাস করত বিশ্ব জগতের প্রতিটি বস্তুর কোনো আত্মা আছে এবং তারা সেই আত্মার কথা শুনতে পায়। মৃত্যুর পর সন্মানের নিদর্শনস্বরূপ, তাদের সমাধিত করা হত বিশাল বিশাল বাওবাবের মাঝের ফোঁপা গর্তে। পরবর্তিতে সে্নেগালে সরকারী ভাবে এই প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এরকম একাধিক গাছের সন্ধান পাওয়া যায় যার এক একটির ভেতর একশর অধিক ব্যক্তিকে সমাধিত করা হয়েছিলো। বান্দিয়া সাফারি পার্কের এই বিশাল বাওবাবটি সেই প্রথার চিহ্ন ধরে রেখেছে।













এছাড়াও 'La Reserve De Bandia' সাফারি পার্কটি ৩৫০০ হেক্টর বিস্তৃত অঞ্চল অসংখ্য প্রাণীর সংরক্ষণ স্থান হিসেবে গণ্য। তাদের মধ্যে বাফেলো, অ্যান্টিলোপ, কুডু, ইম্পালা, গেজাল, কুমির, কচ্ছপ, বানর ইত্যাদি। আর পাখীদের মধ্যে রয়েছে - স্মল হর্নবিল, গ্রে হেরন, ব্লাক বার্ড, ঈগল, মাছ রাঙ্গা ইত্যাদি। উল্লেখ্য, এই পার্কটিতে কোনো হিংস্র পশু রাখা হয়নি।

..........................................................................................

আফ্রিকায় সাফারি আগ্রহীদের জন্য টিপস-

১। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি আবহাওয়া অতীব চমৎকার।
২। আফ্রিকায় আসার আগে ফ্রেঞ্চ ভাষাটা মোটামোটি রপ্ত করে আসা ভালো। আমারা পার পেয়েছিলাম আমদের ড্রাইভার কিছুটা ইংলিশ ও লোকাল ভাষা জানতো বলে। এখানকার ফ্রেঞ্চ অধ্যুষিত অঞ্চলের লোকেরা ইংলিশ একদমই বুঝে না।
৩। সাফারিতে যাওয়ার উপযুক্ত সময় ভোর বা সন্ধ্যায় যেসময় প্রানীরা কাছের কোনো জলাধারে পানি খেতে আসে, সেক্ষেত্রে তাদের খুঁজে বের করতে গোল গোল ঘুল্লি দেয়া একটু কম লাগে।


Thursday, 8 November 2012

অবিচুয়ারি

আর এখন, যখন ঘুমে চোখ জড়ায়ে এলো, তুমি এলে
কত রাতের জমানো ঘুম এলো এবেলা
বুজে আসা পাতার ভার
ঝাঁপ ফেলে ঢেকে দিয়েছে ক্লান্তি
সবটুকু জোড় এক করেও
মেলতে পারিনি তা

কখন নিভে গেছে শেষ রাতের উত্তাপটুকুও
শুকনো ছাইয়ে পড়ে থাকা খড়কুটো আবেগ
ফেরায়নি কিছুই,
বেড়েছে আরো; আরো বোঝা
আর তীব্র শীত জমিয়ে দিয়েছে
আমার প্রতিটি কোষ

যাও ফিরে যাও,
নিয়ে যাও মুঠো ভরে সবটুকু আলেয়া
এ ঝলকানি আজ অর্থহীন!
টানে না; ক্ষতবিক্ষত করে না
বোধহীন অস্তিত্বকে
ভরা জ্যোৎস্ন্রাও ছুঁতে পারেনি
যে অমানিশা

পাতা ঝরার দিনে, বসন্তের গান বেমানান
রঙের শেষ বিন্দুটা ঢেলে যে ছবি এঁকেছি
তাও কেমন ফিকে
চেতনার সমস্ত রঙ মজে লীন হয়ে
যে ধূসরটা পেয়েছি
আজ তাই বেশ!

Monday, 10 September 2012

বিস্মৃতির বালুতট

একটার পর একটা ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে পায়ের কাছে। সাদা ফেনার তলে কত রাশি রাশি বালির নিত্য তটে জমা হওয়া, আবার ঢেউয়ের সাথে গা ভাসিয়ে চলে যাওয়া এ এক নিরন্তন খেলা। কিছু রেখে কিছু টেনে নেয়া এ শুধুই সাগরের অবাধ্য ঢেউগুলোর ছেলেমানুষি ছাড়া আর কি বা হতে পারে! তারপর কত দেশ যে জেগে ওঠে জলের বুকে আবার ভুস্ করে কত কিছু তলিয়ে যায় কোনটারই হুঁশ থাকে না এই আপন খেলায় মেতে থাকা অবাধ্য জল-শিশুগুলোর। মানুষের জীবনটাও তো সাগরের জল আর তীরের মাঝামাঝি এই অংশটার মতই, প্রতি মুহূর্তে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো যেন ছোট বড় একেকটা ঢেউ, যা সাথে করে নিয়ে আসে বালির আস্তরণের মত নানা অভিজ্ঞতা ও পাওয়া-না পাওয়ার গল্প, আর টেনে নিয়ে যায় জীবন থেকে অতিমূল্যবান সময়গুলো। ভেজা বালিতে পায়ের ছাপ তুলে হাঁটতে হাঁটতে এরকম নানা ভাবনায় মেতে থাকে খেয়া, ঢেউগুলো তার সাথেও খেলা শুরু করেছে, পায়ের তল থেকে সুরসুর করে বালিগুলো টেনে নিয়ে যাচ্ছে, আবার কিছুটা আহ্লাদ করে পা ছুঁয়েও দিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই আপনমনে কখনো জল কখনো বালি স্পর্শ করতে করতে সে হেঁটে এসেছে বেশ খানিকটা। পেছন ফিরে তাকায়, মেয়েটা এখনো বালি নিয়ে খেলছে। কিছু একটা তৈরি করছে। কিন্তু ভাটার কারণে সাগর অনেকটা নিচে নেমে যাওয়ায়, বালিগুলো শুকিয়ে আসছে, সহজে জমাট বাঁধছে না। তাই সে একটু পরপরই দৌড়ে সাগর থেকে হাতের তালু করে জল নিয়ে আসছে, ছোট হাতে আর কতটুকুই বা ধরছে, তার থেকে আবার ফিরতে ফিরতে প্রায় সবটাই পড়ে যাচ্ছে। মেয়েটার কষ্ট দেখে মায়া হয় খেয়ার, আবার মজাও লাগে বেশ।

পাশেই পিয়াস অলসভাবে শুয়ে কি একটা পড়ছে।

বাবা আমাকে একটু হেল্প করবা, প্লিজ? আদুরে গলায় কিছুটা ক্লান্তি ও অভিযোগ মিশিয়ে বলে তিতির, প্রিন্সেস ফিওনা-র প্যালেস বানাচ্ছি কিন্তু বালিগুলো শুধু পড়েই যাচ্ছে! পচা বালি! নির্বোধ বালিগুলোর উপর তার সবটুকু বিরক্তি ঝেড়ে বলে তিতির।

মেয়ের কথায় হাসে পিয়াস, আজকাল মেয়ে এই একটা গালি শিখেছে 'পচা', এই বিশেষ শব্দটুকু বলার ভঙ্গিটাও দারুণ, চোখ-নাক কুঁচকে, ঠোঁট ফুলিয়ে বলে 'পচ-চা'।

শিওর মাম! আমই এক্ষুণি বানিয়ে দিচ্ছি তুমি কিছু শামুক-ঝিনুক কুড়িয়ে আনো তো দেখি, প্রিন্সেসের প্যালেস সাজাতে হবে তো!

মুহূর্তে সব ক্লান্তি ভুলে আনন্দে চড়ুই পাখির মত লাফিয়ে উঠে তিতির, ফ্রকের কোছা পেতে চারপাশে শামুক-ঝিনুক কুড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

পিয়াস তার সবটুকু নৈপুণ্য ঢেলে মেয়ের জন্যে বালির প্রাসাদ বানাতে শুরু করে, কোছা ভরে মনি-মুক্তা এনে খুশিতে দিশেহারা হয়ে পড়ে তিতির, ক্রমাগত লাফাতে আর চিৎকার করতে থাকে - মা, ও মা, দেখ বাবা আমার জন্য কি সুন্দর প্যালেস বানিয়েছে! পিয়াস অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মেয়ের দিকে, তিতিরের এত অল্পতে এই বাঁধভাঙ্গা খুশি হবার ক্ষমতা মুগ্ধ করে তাকে! মনের ভেতরে কোথেকে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পরে এক পলশা স্নিগ্ধ তৃপ্তির আবেশ!

তিতিরের চেঁচামেচিতে খেয়া না এসে পারে না, পিয়াসের শিল্পকর্মে সেও একটু থমকে যায়, অস্ফুটে নিজেকেই বলে, ক্যামেরাটা(?!)। এক ছুটে ক্যামেরা নিয়ে ফিরে আসে সে, ততক্ষণে বাবা মেয়ে মিলে অতি যত্নে শামুক-ঝিনুক দিয়ে বালির প্রাসাদ সাজাতে ব্যস্ত, শব্দ না করে খুব সাবধানে ফটাফট কয়টা স্ন্যাপ নিয়ে নেয় খেয়া!

আর একজনের কথা বলা হয়নি, পুরোপুরি নিজের মধ্যে আছে সে। বিশাল তটের সাদা বালি, মত্ত উম্মাদনায় আছড়ে পড়া ঢেউ কোনো কিছুই তার ধ্যান ভঙ্গ করতে পারে না, পৃথিবীর যাবতীয় বিষয় তার কাছে অমূলক অর্থহীন। কোন গতি তাকে স্পর্শ করে না, কোন সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করে না। বালির উপর উপুড় হয়ে বসে খুব যত্নে একটা একটা করে বেছে বেছে আপাত সকলের কাছে অদৃশ্য কিন্তু তার কাছে অতি মূল্যবান কিছু ডান হাত দিয়ে তুলে বাম হাতে রাখছে, রেখেই যাচ্ছে, আবার বাম হাত থেকে খুব সাবধানে তা ডান হাতে ঢেলে দিচ্ছে, শেষে  নাহ! হয়নি! এমন একটা ভাব করে আবার সব ঝেড়ে বালিতেই ফেলে দিচ্ছে। এই চলছে ঘন্টার পর ঘন্টা, অস্থিরতায় তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে, হাতগুলো থর থর করে কাঁপতে থাকে। কিন্তু কি এক অজানা অথচ অতি জরুরি হিসাব মিলানোর চেষ্টা সে করেই চলে তার সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে, শুধু তা মিলছে না কিছুতেই! দুই একজন পথচারী আচমকা তাকে দেখে থেমে যাচ্ছে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজাও দেখছে অনেকে। কিন্তু সেদিকে মোটেও ভ্রূক্ষেপ নেই তার।

খেয়া তেড়ে এসে প্রচণ্ড বিরক্তি প্রকাশ করে আশেপাশের মানুষগুলোর উপর - এখানে কি? ইজ হেয়ার এনি শো গোয়িং অন। একটা মানুষকে নিজের মত থাকতে দেন, প্লিজ!

বাবার কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে সে, বাবা তার কাঁপা কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে দেয় খেয়ার দিকে। অস্পষ্ট ক্লান্ত গলায় বলে- নেও, হচ্ছে না, পারছি না... না পারার কষ্ট ঠুকরে বের হয় ভাঙ্গা এ কটা শব্দে!

বাবাকে জড়িয়ে ধরে খেয়া, চারপাশের অহেতুক কৌতূহল, মানুষের চোখের তীর্যক প্রশ্নগুলো থেকে আড়াল করতে চায় তাকে। বাবা আবার বলে, 'খুকু, হচ্ছে না, পারছি না'। খেয়ার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে আজকাল বাবা খুব কম তাকে এই নামে ডাকে। শুধু শূন্যে অস্পষ্ট-ঝাপসা চোখে তাকিয়ে থাকে বেশীর ভাগ সময়।

বাবাকে আশ্বস্ত করতে চায় খেয়া - এইতো বাবা সব ঠিক আছে।

বাবার এই অবস্থা তাকে যত না কষ্ট দেয়, তার চেয়ে বেশী কষ্ট দেয় মানুষের বিবেকহীন অসহিষ্ণু আচরণগুলো। প্রতিটা মানুষই তো জীবনের এক পর্যায়ে এসে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, না হয় কিছু অসহায় মানুষকে এই অবস্থায় পথ চলতে হয় আরো খানিকটা। কিন্তু তাতে সকলের এত বাধে কেন! সমাজের তথাকথিত ভারসাম্যমান সুস্থ মানুষগুলোর প্রতিনিয়ত কৌতূহলী জিজ্ঞাসু দৃষ্টি এই পথ চলা যে আরও কঠিন করে দেয়, এটা কেন কেউ বুঝেনা? কেউ কেউ আবার আগ বাড়িয়ে সহানুভূতি দেখাতে আসে, সেটাও ভালো লাগেনা খেয়ার। সে নিজেও দিন দিন অসামাজিক হয়ে যাচ্ছে, বেশ বুঝতে পারে। বাবার যুদ্ধটা তো তাকে একাই লড়তে হচ্ছে - প্রতিনিয়ত ভুলে যাওয়া, তীব্র কোনো প্রশ্নের জাবাব না পাওয়া, কোনো জরুরি হিসেব মিলাতে না পারার যে যুদ্ধ। বাবাতো নিজেও একজন সৈনিক ছিলেন। বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মোঃ জহিরুল হক। মানুষের চোখে সম্মান ও নিয়মানুবর্তিতার প্রতীক ছিলেন তিনি। পুরোটা জীবন যিনি কাটিয়েছেন কঠোর অনুশাসনের মধ্যে। নিজের তিন ছেলে-মেয়েকেও বড় করেছেন একই আদর্শে। কিন্তু আজ সব উলটপালট। যদিও পরিবর্তনটা শুরু হয় মা মারা যাওয়ার পর থেকে। অনেকটা সময় তাকে একাই থাকতে হয়েছিলো। ভাইদের দোষ দিতে পারেনা খেয়া, উচ্চ শিক্ষা-ইমিগ্রেশন, তারপর তারাও তো জীবনের কাছেই জিম্মি। মাঝে মাঝে ফোন করে তারা, দায়িত্ব পালন করতে না পারারও যে একটা কষ্ট আছে, বুঝে খেয়া। শুধু অবাক হয় যখন দেখে ভাইয়েরা তাকে অনেক কিছু এড়িয়ে যেতে চায়, হয়তো একজনের কাছে জানতে হয় আরেকজনের ভ্যাকেশনে ইতালী, প্যারিস যাওয়ার গল্প! কিন্তু কেন? কেন তারা লুকোতে চায় নিজের ভাল থাকার কথাগুলো তার কাছে। সে কি এতোই খারাপ! সে কি হিংসে করবে নিজের ভাইয়ের সুখে!

আজ তিন বছর সে বাবাকে আগলে রেখেছে প্রতিটা মুহূর্তের জন্য। কখনো তো কোনো অভিযোগ করেনি কারো কাছে। ছোট্ট তিতিরটাও ধীরে ধীরে পিয়াসের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। পিয়াস স্বামী হিসেবে সহানুভূতিশীল। পিয়াসের স্বতঃস্ফুর্ত সহযোগিতা প্রায়ই খেয়াকে শক্তি যোগায়। আবার অনেক সময় ছোট কোনো বিষয়ে পিয়াসের চুপ থাকাটাও আঘাত করে তাকে! যদিও পিয়াসও কখনো কোনো অভিযোগ করেনা, তবু কোথাও এক অজানা ভয় সবসময় খোঁচাতে থাকে তাকে।

............

পিয়াসের চাকুরী সুবাদে দেশ-বিদেশ ঘোরার নেশা একসময় খেয়াকেও পেয়ে বসে। কিন্ত আজকাল আর ইচ্ছেমতো বেরিয়ে পড়তে পারে না তারা। এডভান্সড ডিমেনশিয়ার ডাক্তারি সার্টিফিকেট, মেডিকেশনের ঠিক ঠিক নথিপত্র, যেকোন জার্নির পূর্বের প্রয়োজনীয় শারীরিক ফিটনেস চেক আপ ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও এয়ারপোর্টগুলোতে নানা প্রশ্ন আর অমূলক সতর্কতার জবাব দিতে দিতে মাঝে মাঝে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মানুষ যেখানে নিজেকে সভ্য হিসেবে দাবী করে, সেখানে একজন অসহায় মানুষের জীবন সভ্যতার দোহাই দিয়ে অকারণ জটিলতায় ভরে দিয়ে কি আনন্দ পায়, এটাই রহস্য মনে হয় তখন। কেন কেউ বাবার মানসিক বিপর্যস্ততাকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না, যেখানে মেডিকেলী তিনি শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ একজন মানুষ। সে সব কিছু বাবাও দাবী করে যা একজন মানুষ হিসেবে তার প্রাপ্য। কেন এটা বোঝাতে এত বেগ পেতে হয় তার। কদিন আগে তেমনি বাংলাদেশ থেকে ফেরার পথে ঢাকা থেকে দুবাইগামি প্লেনটিতে বাবা কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো। ঠিক অসুস্থও বলা যায়না, ঘুমের মধ্যে ঠাণ্ডায় কাঁপছিল সে। এয়ারহোস্টেসের কাছে কম্বল চেয়েছিলো খেয়া। এয়ারহোস্টেস জিজ্ঞেস করেছিলো, কোনো সমস্যা?

খেয়া বলছিলো, আমার মনে হয় তার ঠাণ্ডা লাগছে, একটু কাঁপছে মনে হলো।

এয়ারহোস্টেসটির কি মনে হলো কে জানে, সে তার আরো দুএকজন সহকর্মীকে ডেকে আনলো, তারা খুব বিচক্ষণতার সাথে বাবাকে ঘুমের মধ্যেই নেড়ে-চেড়ে দেখা শুরু করলো। খেয়া বাধা দিয়ে বল্লো, সে ঘুমাচ্ছে, তাকে ঘুমোতে দিন।

তারা বিজ্ঞের মত বললো, তোমার বাবা কোনো রেসপন্স করছে না কেন?

খেয়া বললো, তার মানসিক অবস্থা এবং এর কারণে চলা মেডিকেশনের জন্যে, তার ঘুম এরকম হয়ে গিয়েছে। আমি তাকে এভাবে ঘুমোতে দেখতে অভ্যস্ত।

তারা, মেডিকেশন্স-এর কাগজ পত্র দেখতে চাইলো।

এগুলো সবসময় খেয়া প্রস্তুত রাখে, দেখানো হলো।

ইতোমধ্যে, যাত্রীদের মধ্যে থেকে একজন পেশাদার ডাক্তার অ্যানাউন্স করে আনা হলো। বাবার প্রেশার, ডায়াবেটিস সব চেক করা হলো। সব ঠিক আছে। ডাক্তারের কাছ থেকে জানা গেলো, এয়ার ক্র্যাফট টীম আশংখা করছে এটা খিঁচুনির সিম্পটম কিনা। ডাক্তার তাকে জিজ্ঞেস করে এর আগে এরকম কিছু ঘটেছে কিনা।

খেয়া প্রতিবাদ করে বলে, আমার বাবার এখন পর্যুন্ত খিঁচুনি বা এই টাইপ কোনো সমস্যা হয় নাই। যেহেতু তিন বছর আমি তাকে পুরোপুরি টেক-কেয়ার করছি আমি তার মধ্যে কোনরকম অ্যাবনরমাল সাইন দেখতে পাচ্ছি না। সে স্রেফ ঘুমাচ্ছে আর কিছুই না। সে আরো বলে, তিন বছর যাবত নিয়মিত আন্টি ডিপ্রেশন, পারকিনসন্স ও অন্যান্য এন্টি অ্যাংযাইটি ড্রাগের কারণে তার ঘুম কিছুটা অস্বাভাবিক রকমের গাঢ় হয়ে গিয়েছে। ব্যাস!

তারপরেও তাদের সন্তুষ্ট মনে হলো না। কাগজে ডিটেলস রিপোর্ট নেয়া শুরু করলো। শেষে বলল তোমার বাবাকে ল্যান্ডিং-এর পর এয়ারপোর্ট ক্লিনিকে নেয়া হবে। সেখানে দেখা হবে সে ফারদার ফ্লাইটের জন্য ফিট কিনা।

পিয়াস জিজ্ঞেস করল, আমাদের চার ঘণ্টা পর নেক্সট কানেক্টিং ফ্লাইট, এর মধ্যে সব হবে কিনা?

এয়ারহোস্টেসটি মুখে হাসি টেনে বললো, আশা করছি, এটা শুধু একটা রেগুলার ফিটনেস চেকআপ। যদি ক্লিনিক থেকে বলা হয় তিনি নেক্সট ফ্লাইটের জন্যে সম্পূর্ণ ঠিক আছেন তাহলে তোমরা অবশ্যই কানেক্টিং ফ্লাইটটা পাবে নাহলে তোমাদের অপেক্ষা করতে হবে তার সুস্থ্য হওয়া অব্দি।

পিয়াস কে কিছুটা চিন্তিত মনে হলো। দুবাই থেকে তাদের গন্তব্য লন্ডনের গ্যাটউইক এয়ারপোর্ট সেখানে হোটেল বুকিং দেয়া আছে। কিন্তু সমস্যা সেটা না, সমস্যা হলো পুরো প্ল্যানটা সেভাবেই সেট করা ছিলো, লন্ডনে পৌঁছানোর পরদিন সকাল দশটায় তার অফিসের জরুরি কনফারেন্স, এখানে শিডিউল উল্টাপাল্টা হলে হয়তো সেটা মিস হয়ে যাবে। বিষয়টিকে বাড়ানো হচ্ছে অহেতুকভাবে, কিন্তু কিছুই করার নাই। মানুষটাকে তিন বছর ধরে কাছ থেকে দেখছে পিয়াস, তার সমস্যা শুধু ভুলে যাওয়া, যে কারণে মাঝে মাঝে খুব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে নিজে থেকেই, এই ভুলে যাওয়াটা দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। নিজের কোনো কাজ সে এখন আর করতে পারে না। বিষয়টা এমন যে, এক পা এগিয়ে পরের পা তুলতে সে ভুলে যায়। কিন্তু তারপরেও শারীরিকভাবে সে সম্পূর্ণ সুস্থ। এই বয়সী যেকোন আর দশটা মানুষের থেকে নিঃসন্দেহে সে সুস্থ একটা মানুষ - প্রেসার, হাই কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিসের মত সমস্যাগুলো তার নেই, এমনকি সাধারণ সর্দিজ্বরে ভুগতেও তাকে কম দেখেছে পিয়াস। হয়তো ভুলে যাওয়ার এই রোগ তার নিত্যনৈমিত্তিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে অনেক, এক্ষেত্রে আচরণগত কিছু পরিবর্তনও অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু তা কখনো অন্যের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি।

............

ল্যান্ডিং এর পর ইমার্জেন্সি প্যাসেঞ্জারের স্পেশাল এ্যাম্বুলেন্স করে তাদের এয়ারপোর্ট ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে সব কিছু চেক করে জানানো হলো তিনি ঠিক আছেন, কোনো অস্বাভাবিকতা তারাও পেলেন না। যদিও তখনো তিনি ঘুমের মধ্যেই আছেন। ক্লিনিক থেকে একজন ইন্ডিয়ান ডক্টর জিজ্ঞেস করলো, তোমাদের পরের ফ্লাইট কখন?

পিয়াস উত্তর দিলো, রাত বারোটায়।

ডক্টর বলল, এখন বাজে ন'টা। তার মানে এখনো তিন ঘন্টা বাকি আছে। উনি তো এখন ঘুমোচ্ছেন, এখন টানাটানি না করে, ঠিক এক ঘন্টা আগে নিয়ে গেলেও হবে। এখান থেকে ডাইরেক্ট তাকে বোর্ডিং গেটে পৌঁছে দেয়া হবে। তোমরা চাইলে এয়ারপোর্ট-এর ক্যাফে শপগুলো থেকে ঘুরে আসতে পারো, ঠিক উপরের ফ্লোরেই। খেয়া বাবাকে রেখে যেতে চাইলো না।

পিয়াস মেয়েকে নিয়ে গেলো উপরে, তাকে কিছু খাওয়ানো দরকার। এইসব ঝামেলার মাঝে তাদের মতো মেয়েটারও রাতের খাওয়া হয়নি।

খেয়া লম্বা করিডোরের পাশে পাতা চেয়ারগুলোতে বসে ভাবতে থাকে - বাবার ডায়াপারটা বোধহয় পাল্টানো দরকার, ঘুম থেকে উঠলে কি খেতে দেবে তাকে, সেই কোন বেলা খেয়েছে!

কেন জানি হসপিটালের ভেতর অপেক্ষা সব সময় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর লাগতে থাকে, দুঘন্টা সময় যেন দু যুগের সমান দীর্ঘ হয়ে অবশেষে শেষ হলো।

নিয়ম অনুযায়ী হুইল-চেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট এসে তাদের নিয়ে গেলো। ডিজেবলদের জন্যে এয়ারপোর্টগুলোতে বিশেষ এক রকম ব্যাটারীচালিত গাড়ির ব্যবস্থা থাকে। তিতির সে গাড়ি দেখে মহা আনন্দে আগেই সেখানে চড়ে বসে, পিয়াস আলাদা হয়ে যায় তাদের থেকে। বোর্ডিং-এর জন্যে তাদের নির্দিষ্ট গেটে আনা হয়। তারা সেখানে পিয়াস এর জন্যে অপেক্ষা করতে থাকে। এর মধ্যে বাবার সে গাঢ় ভয়ঙ্কর ঘুম পুরো হয়েছে। সে বড় বড় চোখ করে এদিক ওদিক দেখছে। কিছুটা অস্থির মনে হয় তাকে। হুইল চেয়ার থেকে বার বার উঠে হাঁটতে চাচ্ছে। বিশাল বড় এয়ারপোর্টের এক মাথায় তাদের বোর্ডিং গেট। পিয়াসের হেঁটে আসতে বেশ অনেকক্ষণ লেগে যায়। হুইল-চেয়ার আরোহী বলে সবার আগে তাদের যেতে দেয়া হয় ভিতরে। টানেলের শেষ মাথায় প্লেন এর দরজায় যেখানে এয়ারহোস্টেসরা হাসি মুখে যাত্রীদের অভ্যর্থনা জানায়, সেখানে দেখা গেলো একজন এয়ারহোস্টেস বাবার নাম আর ডিটেলস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সে ঢোকার মুখে তাদের থামিয়ে দিয়ে বলে, এক্সকিউজ মি স্যার, তিনি কি মি. জহুরুল হক? যিনি লাস্ট ফ্লাইটে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

পিয়াস জবাব দিলো, হ্যাঁ, কিন্তু তিনি অসুস্থ ছি্লেন না। ঘুমিয়ে ছিলেন।

এয়ার হোস্টেজ বললো, তিনি পুরো প্লেনে কোনো রেসপন্স করেননি, অস্বাভাবিক ছিলেন, আমাদের কাছে রিপোর্ট আছে।

পিয়াস, আমরা মাত্র তাকে এয়ারপোর্ট ক্লিনিক থেকে নিয়ে আসলাম, সেখান থেকে বলা হয়েছে তার কোন সমস্যা নেই, তিনি ফ্লাই করতে পারবেন।

প্লিজ আপনারা এখানে একটু অপেক্ষা করুন, আমি ক্যাপ্টেনের সাথে কথা বলে আসছি। বলে সে ভেতরে চলে গেলো।

অন্য একজন এসে বলল, আপনারা একটু সাইড হয়ে দাঁড়ান। যাত্রীদের ভেতরে নেয়া হবে।

তারা অপেক্ষা করতে লাগলো, একে একে অন্যযাত্রীরা যার যার মতো ভেতরে যেতে লাগলো। তা দেখে তিতির কান্না শুরু করে দিলো। তার একটাই প্রশ্ন - আমাদের কেন যেতে দিচ্ছে না? বাবাকে ততক্ষণে কিছুতেই হুইল-চেয়ারে বসিয়ে রাখা যাচ্ছে না, সে উঠে হাঁটতে চায়।

প্রায় আধ ঘন্টা পর সেই এয়ারহোস্টেসটি ফিরে এসে বলল, সরি স্যার আমি কোনোভাবেই ক্যাপ্টেনকে কনভিন্স করতে পারলাম না। তিনি আগের ফ্লাইটের ক্যাপ্টেনের সাথে যোগাযোগ করেছেন, এবং তিনি বলেছেন আপনার বাবা ফ্লাই করতে পারবে না।

পিয়াস কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, তিনি তো পাইলট, ডক্টর না। কেমন করে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারে কে ফ্লাই করার জন্য ফিট কে ফিট না!

তারপর এয়ারহোস্টেস যা বললো, তা হলো - একটা ফ্লাইটে ক্যাপ্টেন হলো প্রধান যেমনটা একটা দেশে একজন রাজাই প্রধান। ক্যাপ্টেন তার এয়ার ক্র্যাফটের স্বার্থে ছোট বড় যেকোন রকম সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা রাখেন। এবং যা অন্যরা মেনে নিতে বাধ্য।

আমি অন্তত একবার ক্যাপ্টেনের সাথে কথা বলতে চাই। আমি তাকে বলতে চাই প্লিজ একবার এসে দেখুন যে মানুষটা আগের ফ্লাইটে অচেতন ছিলো বলে আপনারা ভাবছেন সে এখন দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছে। তিনি কথা বলতে ভুলে গিয়েছেন, হয়তো একজন স্বাভাবিক মানুষের মত আচরণ করতেও ভুলে গিয়েছেন, কিন্তু তারপরেও তার নিজস্ব একটা ভাষা আছে। আর একজন মানুষ হিসেবে যেটা বোঝা কারো জন্যে খুব বেশী কষ্টের নয়! প্লিজ, ডোন্ট বি "কমফরটেবলি নাম্ব"! - অস্থিরতা ফুটে উঠে পিয়াসের গলায়।

এয়ারহোস্টেসটি কিছুটা সহানুভূতির স্বরে বললো - এটা সম্ভব নয়, আমি আপনার হয়ে চেষ্টা করেছি, আমাকে বিশ্বাস করুন। আপনি বরং এয়ারলাইন্স এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করুন, তারা হয়ত আপনাকে কোন হেল্প করতে পারে। আমি আপনাদের জন্যে পুরো ফ্লাইটটি দাঁড়িয়ে রাখতে পারি না। আমি এজেন্টকে কল করে ডেকে দিচ্ছি এর বেশি আমি কিছু করতে পারবো না। আমাকে মাফ করবেন।

অনেক ধন্যবাদ! বিস্ময় স্পষ্ট ফুটে উঠে পিয়াসের স্বরে।

............

এর পরের ঘটনা-

পিয়াস দুজন এজেন্টের সাথে মেডিকেল সেন্টার, পরবর্তী ফ্লাইট বা অন্য কোন ফ্লাইটের টিকেটের উদ্দেশ্যে যায়।

তিতির খেয়ার কোলে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে, তাদের নিয়ে আসা হয় ডিজেবল লাউঞ্জে। রেফ্রিজারেটরের মত ঠাণ্ডা লাউঞ্জটিতে শোয়ার চেয়ারগুলো আগে থেকেই দখল হয়ে ছিলো। খেয়া তিতির কে কোনমত হ্যান্ড ব্যাগ আর একটা কম্বল দিয়ে শক্ত চেয়ার এর উপর শুইয়ে দেয়।

আর বাবা, পুরো লাউঞ্জটিতে বিক্ষপ্তভাবে সে হেঁটে বেড়াচ্ছে, তার অবচেতন মন যা এখনো তাকে সংকেত দেয় কোন অজানা ভাষায়, বলছে, কোথাও কোন সমস্যা হচ্ছে, হয়তো এর জন্যে সে দায়ী। এই ভাবনা তাকে অস্থির করে তুলছে। সে ঠিক বুঝতে পারে কিছু একটা এমন হচ্ছে যা এরকম হবার কথা না। কিন্ত সে জানে না কিভাবে সেটা ঠিক করবে। ভিতরে ভিতরে আরো অস্থির হতে থাকে, কারণ তার চিন্তাগুলো, তার হিসেবগুলো কোথায় যেন শুধু জট পাকিয়ে যায়। অনরবরত চেষ্টা করে সে জট খোলার, কিন্তু সব কেমন ক্রমে আরো গুলিয়ে যেতে থাকে।

খেয়া এসে বাবার হাত ধরে, বাবা অস্পষ্ট ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলতে থাকে - খুকু, হচ্ছে না, পারছি না!

খেয়ার চোখ দিয়ে অবশেষে জল গড়িয়ে পড়ে! সব সময় স্রোত ধরে রাখা কাজের কথা নয়। খালামণি বলেছিলো - খেয়া মা আমার, তোর কষ্ট আমি সহ্য করতে পারছি না, তোর বাবাকে আমার কাছে রেখে যা, আমি তার সব রকম যত্ন নেব, প্রয়োজনে একজন আলাদা লোক রাখব তার জন্য।

খেয়া বলেছিলো - যারটা তাকেই করতে দেও না খালামণি। বাবাও তো তার সব শক্তি দিয়ে আমাদের পেলেছে, কষ্টের ভয়ে তো আমাদের অন্য কারো কাছে দিয়ে দেয়নি।

"আই ওয়ান্ট টু সি অল দা মারভেলস অফ দা ওয়ার্ল্ড কিপিং দা অয়েল ইন দা স্পুন।"

...............


(কিছু বাস্তবতা গল্পের মত করে সাজানোর চেষ্টা করলাম, চরিত্রগুলো সব কাল্পনিক। খুব বেশী বড় হয়ে গেলো, খণ্ডাইতে ইচ্ছা করলো না। তারপরেও আদৌ কিছু বলা হলো কিনা জানিনা!)